কাবেরী নিয়ে জলযুদ্ধ আসলে রোগের উপসর্গ; ভয় হয়, এই রোগের উপশম কি আদৌ হবে?
নানা মাধ্যমে চিত্রগুলি দেখে অনিল কাপুর-অমরিশ পুরী অভিনীত 'নায়ক' ছবিটির কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। ছবিতে দেখিয়েছিল একটি ছেলের বাস থেকে পরে যাওয়াকে কেন্দ্র করে ছাত্র এবং বাসকর্মীদের মধ্যে বচসা কিভাবে মুহূর্তে দাবানলের আকার নিয়ে সম্পূর্ণ মুম্বই শহর এবং মহারাষ্ট্র রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলকেও গ্রাস করে ফেলে এবং সর্বেসর্বা রাজনীতিবিদকূল আড়াল থেকে মজা দেখতে থাকেন।
ভারতের মতো দেশে যে এমন ঘটনা শুধু চলচ্চিত্রেই সীমিত থাকে না তা সম্প্রতি দেখা গেল বেঙ্গালুরু শহরে। কাবেরী নদীর জলবণ্টন নিয়ে তামিলনাড়ুর সঙ্গে আকচা-আকচি তো আগের থেকে ছিলই, তার উপর সুপ্রিম কোর্টের জল ভাগাভাগি করার রায় আসতে না আসতেই যেন আগুনে ঘৃতাহুতি হল। বাস-ট্রাক-যানবাহন পোড়ানো হল, কোটি কোটি টাকার লোকসান হতে দেখা গেল, কার্ফু জারি হল, এমনকি মানুষও মারা পড়ল। জলের সমস্যা আদৌ কিছু মিটল কিনা, তা অবশ্য জানা হল না। পরবর্তী দিনে আবার এমন দিন যে দেখা যাবে না, তার নিশ্চয়তা কিন্তু রাষ্ট্র দিতে পারল না।

জল দেব না, কিন্তু জলের সংরক্ষণও করব না?
এই তুমুল ডামাডোলের মধ্যে কিন্তু মাথায় একটা চিন্তা ঘুরঘুর করতেই লাগল। এই যে জল, জল করে এতো গগনভেদী চিৎকার শোনা যাচ্ছে, জল সংরক্ষণের ব্যাপারে কি সেরকম কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে? দক্ষিণ ভারতের অনেক জায়গাতেই প্রবল জলকষ্ট বহুদিন ধরেই। বেঙ্গালুরু, চেন্নাই বা হায়দরাবাদ-এর মতো বড় শহরগুলিতেও তার অন্যথা নেই। অথচ প্রবল বর্ষণের পরেও সেই কষ্ট লাঘব হয় না।
গতবছর শেষের দিকে যে চেন্নাই শহরে অস্বাভাবিক বৃষ্টি-বন্যা হল, তার কতটুকু জল সংরক্ষিত হয়েছে? বেঙ্গালুরু শহরে এইবছর গ্রীষ্মে জলাভাবে ত্রাহি অবস্থা প্রত্যক্ষ করা গিয়েছিল, কিন্তু বর্ষার আগমনী ধ্বনিতেও কি চেতনায় কোনও বদল হয়েছে? তাহলে একটি নদীর জল বন্টন করা নিয়ে এমন ভয়ঙ্কর কাণ্ড কেন?
আসল সমস্যা বোধহয় আরও গভীরে
আসলে জলবন্টনের ব্যাপারটা বোধহয় কাহিনীর একটি অংশমাত্র। আসল সমস্যা হচ্ছে ভারতের খণ্ডজাতীয়তাবাদ, যাতে একবার আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছিটকে এসে পড়লে আর নিস্তার নেই। কর্ণাটক-তামিলনাড়ুর এই সংঘাত নিঃসন্দেহে দুটি সত্তার, কিন্তু ভয় হয় এই ভেবে যে এই বিপদ তো যেকোনওদিন অন্যদিক দিয়েও আসতে পারে। মহারাষ্ট্রের খন্ডজাতীয়তাবাদী রাজনীতির ধারক এবং বাহক যাঁরা, তাঁরা বলিউড নামক জাতীয় শিল্পটিকে বিশেষ দেখতে পারেন না। কারণ, তাঁরা ভাবেন এতে রাজ্যটির নিজস্ব সংস্কৃতি ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।
একইরকম ভাবে, যদি কাল কর্ণাটক-তামিলনাড়ুর জলসৈনিগণ হঠাৎ ভাবতে শুরু করেন যে তাঁদের এই সংগ্রামে এখানকার তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের কাজ করা বিপুল সংখ্যক 'বহিরাগত' যথেষ্ট উৎসাহ দেখাচ্ছেন না, অতএব তাঁদেরও লক্ষ্য করো -- তবে তার পরিণাম কী হতে পারে?
কর্ণাটক বা বলা ভালো বেঙ্গালুরুতে যে 'বহিরাগতদের' বিপুল প্রবেশ চলেছে এবং শহরের/রাজ্যের সমৃদ্ধির পিছনে এই মানুষগুলির অক্লান্ত পরিশ্রমের একটা বড় ভূমিকা রয়েছে, তা অস্বীকার করা চলে না। কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মেই স্থানীয় মানুষজনের মধ্যে একটা বড় অংশ রয়েছে যাঁরা এই কর্মযজ্ঞে সামিল হতে ব্যর্থ। এর ফলে তৈরি হচ্ছে, বা সর্বকালেই সর্বস্থানেই এমন পরিস্থিতিতে তৈরি হয়েছে, একটি তীব্র আক্রোশ যা ক্রমশ চেহারা নিচ্ছে একটি অদৃশ্য বিভেদের। আর এই বিভেদই প্রবল আকার ধারণ করছে যখন কাবেরী জলবণ্টন নিয়ে আদালত ফের একটি রায় দিচ্ছে।
কাবেরীর জল নিয়ে বিবাদ আসলে রোগ নয়, রোগের উপসর্গ মাত্র। আর এই রোগ নির্মূল করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হচ্ছে উন্নয়ন -- বহিরাগত-ভূমিপুত্র ব্যতিরেকে। তথ্যপ্রযুক্তির বহুজাতিক কর্পোরেটের কোনও দায় নেই এই উন্নয়ন যাতে সবার ঘরে পৌঁছয় তা দেখা। তার শুধু কাজ বাজারে পাওয়া দক্ষ শ্রমিককে ব্যবহার করা, যথাযত মুনাফার বিনিময়ে, তা সে ভূমিপুত্র হোক বা বাইরের লোক। উন্নয়নের কাজটা, এবং তা ব্যাপক আকারে, রাষ্ট্রকেই করতে হবে। আর করতেই হবে কারণ বেঙ্গালুরুতে ক'দিন ধরে যা চলল, তা যদি নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়, তবে শহর বা রাজ্যের আসল চালিকাশক্তি -- ওই কর্পোরেটরা পাততাড়ি গোটাতে বিলম্ব করবে না। আর তার ফল ভুগবে রাষ্ট্র, সরকার, ভূমিপুত্র, বহিরাগত সবাই।
কিন্তু উন্নয়ন যদি রাজনৈতিক স্লোগানই থেকে যায়, তবে বড় বিপদ
কিন্তু বাজার-অর্থনীতির এই দিকটি যেমন ধ্রুব সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে সংকীর্ণ রাজনীতির এঁদোগলি খুঁজে বেড়ানো রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা কিন্তু সেই সার্বিক উন্নয়ন চাইবেন না। কারণ যেদিন ওই ভূমিপুত্ররা উন্নয়নের ধারায় স্নাত হয়ে বুঝে যাবে যে ঝান্ডা উঁচিয়ে নয়, আসল জয় আসে শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের হাত ধরে সামাজিক-অর্থনৈতিক বিবর্তনের মাধ্যমে, সেদিনই সবরকম ধান্দাবাজি ও বিষাক্ত রাজনীতির প্রয়োজন ফুরোবে। আর ভূমিপুত্র-বহিরাগত নামক রাজনৈতিক বিভেদটি যদি সত্যিকারের উন্নয়নের ফলে মুছে যায়, তা হলে তো সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদদের অস্তিত্বই সংকটে পড়ে যাবে।
অতএব, মানুষের মধ্যে ক্রমাগত বিভাজন বাড়িয়ে চলা আর সমস্ত চক্ষুলজ্জা ত্যাগ করে মধ্যবিত্ত তোষণ করা চলতেই থাকবে কারণ তাতে অনেকভাবে উপকৃত হওয়া যায়। আজকের ভারতের প্রতিভাবশালী মধ্যবিত্তকে চটিয়ে ভর্তুকি তুলে দিয়ে অন্যদের উন্নয়নের পথ খুলে দেওয়ার 'দুঃসাহস' কোনও নেতা বা দল দেখাবে না, তাতে আরও কিছুদিন কার্ফু চলে তো চলুক। বিশ্বায়িত অর্থনীতি আজ আমাদের সামনে বিশাল দরজা খুলে দিয়েছে কিন্তু আমরা তাতেও সার্বিকভাবে নিজেদের উন্নতি করতে পারছি না, তার কারণ এই বিভেদকামী রাজনীতি।
কিন্তু এই রাজনীতি যদি চলতেই থাকে, তবে বেঙ্গালুরুর রাস্তার ওই ভয়ঙ্কর দৃশ্যগুলি অতীত হওয়ার নয়। যে শহরটিকে আজ বিশ্বের দরবারে ভারতের অন্যতম মুখ ধরা হয়, সেখানে যদি এমন কাণ্ড হয় এবং ভবিষ্যতেও হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে 'ইন্ডিয়া' আর 'ভারতের' মধ্যেকার দূরত্ব চিরকালই অনতিক্রম্য থাকবে বলেই মনে হয়।
-
বনগাঁ দক্ষিণ কেন্দ্রে ভোটের আগে বিতর্ক, তৃণমূল প্রার্থীর শংসাপত্র নিয়ে হাই কোর্টে বিজেপি প্রার্থীর চ্যালেঞ্জ -
শোকস্তব্ধ বিজয়গড়! ছেলের শোকে ভেঙে পড়েছেন রাহুলের মা, কেমন আছেন পরিবারের বাকিরা? -
মমতা আইনের ঊর্ধ্বে নন, কড়া পদক্ষেপের দাবি জানিয়ে মন্তব্য শুভেন্দুর, তুললেন গুরুতর অভিযোগ -
তৃণমূলের ধাক্কা! মুখ্যসচিব-সহ আধিকারিক অপসারণের বিরুদ্ধে মামলা খারিজ করল হাই কোর্ট, কমিশনের সিদ্ধান্ত বহাল -
আজও বাংলায় ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা, কোন জেলাগুলি ভিজবে? কী বলছে হাওয়া অফিস? জানুন আবহাওয়ার লেটেস্ট আপডেট -
সকালেই বিজ্ঞপ্তি, রাতের মধ্যেই মনোনয়ন জমা, রাজ্যে ভোটের আবহে তৎপর প্রার্থীরা -
নজরে পুরসভাগুলি, ভবিষ্যৎ মনে করিয়ে তৃণমূল নেতৃত্বের কড়া নির্দেশিকা কাউন্সিলরদের জন্য -
ইরানের হুমকি! এপ্রিলের শুরু থেকেই হামলা হতে চলেছে গুগল-অ্যাপল সহ ১৮টি মার্কিন কোম্পানিতে -
ইডেনে প্রথম জয়ের সন্ধানে কেকেআর-সানরাইজার্স, দুই দলের একাদশ কেমন হতে পারে? -
বিশ্বখ্যাত আইটি সংস্থায় একলপ্তে ৩০ হাজার কর্মী ছাঁটাই, ভারতে কাজ গেল ১২ হাজার জনের -
'রাজ্যে কার্যত রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছে'! মোদী ও শাহকে কড়া আক্রমণ মমতার, কী বললেন? -
এবার একটা বড় খেলা হবে, নানুরে মন্তব্য মমতার












Click it and Unblock the Notifications