ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করতে আধিকারিকদের বড় নির্দেশ মোদী-ট্রাম্পের

জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে মুখোমুখি বৈঠকে বসেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফ্রান্সে আয়োজিত এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে দুই রাষ্ট্রপ্রধানই নিজেদের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। দুই দেশের থমকে থাকা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিটি দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য তাঁরা নিজেদের দেশের শীর্ষ আধিকারিকদের জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের পর দীর্ঘ ১৬ মাস দুই দেশের শীর্ষ নেতার কোনো দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়নি। ফলে ফ্রান্সের মাটিতে আয়োজিত এই বৈঠক কূটনৈতিক সীমানা পেরিয়ে বিশ্ব দরবারে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করছে। দুই দেশের বাণিজ্যে দীর্ঘ সময় ধরে চলা প্রবল নিশ্চয়তাহীনতা ও টানাপড়েন কাটিয়ে উঠতে এই বৈঠক অত্যন্ত জরুরি ছিল। ফরাসি রাজধানী প্যারিসে এক সাংবাদিক সম্মেলনে ভারতের বিদেশ সচিব বিক্রম মিসরি এই বৈঠকের বিস্তারিত বিষয় তুলে ধরেন।

Narendra Modi and Donald Trump at G7

বিদেশ সচিব বিক্রম মিসরি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে ভারত ও আমেরিকার মধ্যে একটি স্থায়ী এবং স্থিতিশীল বাণিজ্যিক পথ উন্মুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিককালে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেটুকু বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা এই বৈঠকের সদর্থক আলোচনার ফলে অনেকটাই কেটে যাবে। মোদী ও ট্রাম্পের বৈঠকের মূল লক্ষ্যই ছিল অমীমাংসিত বাণিজ্য ইস্যুগুলোকে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে নিয়ে যাওয়া।

২০২৫ সালে ভারতীয় রফতানি পণ্যের ওপর ট্রাম্প প্রশাসন অভূতপূর্বভাবে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার পরই দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছিল। এই সংকটজনক আবহেও সম্পর্কের বরফ গলাতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দুই দেশের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য কাঠামো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন জটিল শুল্ক এবং আমেরিকান বাজারে ভারতীয় সামগ্রীর প্রবেশাধিকার নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে চূড়ান্ত আলোচনা থমকে যায়।

বাণিজ্যিক সম্পর্কের এই অচলাবস্থা দূর করতেই আগামী সপ্তাহে উচ্চপর্যায়ের এক সফরে ভারতে আসছেন বিশিষ্ট মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার। নতুন দিল্লিতে তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হবেন এবং অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবেন। বিদেশ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে আশা করা হচ্ছে যে এই শীর্ষস্থানীয় সফরের মাধ্যমে থমকে থাকা বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত রূপ পেতে চলেছে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ওয়াশিংটনে শেষবার প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বসেছিলেন। এরপর দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে আর কোনো দ্বিপাক্ষিক মুখোমুখি বৈঠক সম্ভব হয়নি। প্রধানমন্ত্রী মোদী এই সময়ের মধ্যে আমেরিকা সফর করেননি এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও নতুন দিল্লি সফরে আসেননি। ফলে ফ্রান্সের এভিয়ানের এই বৈঠক দুই দেশের কূটনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়ে স্বাভাবিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের এক বড় সুযোগ তৈরি করেছে।

ভারতের বিদেশ সচিবকে এক সাংবাদিক বৈঠকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে এই দুই শীর্ষ নেতার ঐতিহাসিক সাক্ষাতে প্রতিবেশী পাকিস্তান কিংবা সীমান্তপার সন্ত্রাসবাদের মতো দীর্ঘদিনের বিতর্কিত সমস্যাগুলো স্থান পেল না কেন। বিক্রম মিসরি এই প্রশ্নের অত্যন্ত কূটনৈতিক জবাব দিয়ে স্পষ্ট করে বলেন যে এটি কোনো বিস্তারিত পরিকল্পিত বৈঠক ছিল না। অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ে আয়োজিত এই অনানুষ্ঠানিক সাক্ষাতে কেবল দুই দেশের জরুরি অর্থনীতি সম্বন্ধীয় বিষয়ে আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল।

বিদেশ সচিব আরও মনে করিয়ে দেন যে সন্ত্রাসবাদ দমন এবং উপত্যকায় বহিরাগত উস্কানির প্রশ্নে ভারতের শক্ত অবস্থান আমেরিকার অজানা নয়। ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারকেরা খুব ভালো করেই ভারতের এই উদ্বেগ এবং বিদেশনীতি সম্পর্কে জানেন। তাই এই নির্দিষ্ট বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বৈঠকে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন পড়েনি। মূলত দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক স্বার্থ ও দ্রুত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতেই দুই নেতা এই স্বল্প সময়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন।

ভারত-মার্কিন বাণিজ্যের পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার নতুন চুক্তি নিয়েও ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন বিদেশ সচিব। ইরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সই হওয়া ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী ওই অঞ্চলে সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটছে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, যা সামগ্রিক বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সুসংবাদ।

যদিও ইজরায়েল এই চুক্তি নিয়ে নিজেদের গভীর আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছে, তবে ভারত এই ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছে। বিক্রম মিসরি উল্লেখ করেন যে দীর্ঘ যুদ্ধের পর যেকোনো শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু সংশয় ও জটিলতা থাকা অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু চুক্তিটি যাতে মাটিতে সফলভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদী শান্তিশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকে, সেটাই ভারতের প্রধান কাম্য。

ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে ইরান ও ইজরায়েল উভয়ের সঙ্গেই ভারতের ঐতিহাসিক এবং অসাধারণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুসম্পর্ক বজায় রয়েছে। সেই কারণে পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান জটিল সমীকরণে ভারত যেকোনো ধরনের মধ্যস্থতা করতে অথবা শান্তি বজায় রাখার উদ্যোগে সক্রিয় অংশ নিতে পুরোপুরি প্রস্তুত। নয়া দিল্লি চায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ যেন শান্তিপূর্ণ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ তৈরি করে সংকট দূর করতে পারে।

সব মিলিয়ে, মোদী ও ট্রাম্পের এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু দীর্ঘপ্রতীক্ষিত সাক্ষাৎ কেবল দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের চাকা সচল করার পথই দেখায়নি, বরং বৈস্মিক রাজনীতিতেও ভারতের কূটনৈতিক বিচক্ষণতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। আগামী সপ্তাহে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধিদের দিল্লি সফরের ফলাফল এবং তা দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বাড়াতে কতটা কার্যকরী হবে, সেদিকেই এখন তীক্ষ্ণ নজর থাকবে বিশ্ব কূটনৈতিক মহলের।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+