খামেনেইয়ের শেষকৃত্যে হাজারও মৃত্যুর আশঙ্কা ইরানে! পরিস্থিতি সামলাতে আগাম কবর তৈরি রেখেছে প্রশাসন

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেইয়ের প্রয়াণ পরবর্তী সপ্তাহব্যাপী শেষকৃত্য অনুষ্ঠান ঘিরে এক নজিরবিহীন আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। অনুষ্ঠান চলাকালীন অতিরিক্ত ভিড়ে পিষ্ট হয়ে বা তীব্র গরমে সেদেশে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সে দেশের ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা। বিপুল মানুষের উপস্থিতি ও চরম অব্যবস্থাপনার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জার্মানির প্রভাবশালী সংবাদপত্র 'ওয়েল্ট’-এর একটি সাম্প্রতিক রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, খামেনেইয়ের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে প্রায় দেড় থেকে তিন হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে। একটি গোপন সরকারি নথি এবং তেহরানের পুরসভার অভ্যন্তরীণ নির্ভরযোগ্য সূত্রকে উদ্ধৃত করে ওয়েল্ট জানিয়েছে যে, দেশের চরম সংকটকালীন পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে সেখানে এই আশঙ্কার কথা বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

Iran prepares mass graves for upcoming funeral

ইরানের রেড ক্রিসেন্ট এবং ন্যাশনাল ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট অর্গানাইজেশন যৌথভাবে সেদেশের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মহম্মদ রেজা আরিফকে একটি গোপন চিঠিতে এই বিষয়ে সতর্ক করেছে। সেখানে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত মানুষের উপচে পড়া ভিড় এবং তীব্র গ্রীষ্মকালীন দাবদাহের কারণে শেষকৃত্যের শোভাযাত্রার সময় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

সম্ভাব্য ভয়াবহ বিপর্যয় এড়াতে তেহরানের নগর প্রশাসন ইতিমধ্যেই বেশ কিছু চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জানা গেছে, নিখোঁজদের সন্ধান, জরুরি উদ্ধারকাজ এবং সম্ভাব্য মৃতদেহ সৎকারের জন্য একটি বিশেষ উদ্ধারকারী দল বা আপৎকালীন ইউনিট গঠন করেছে প্রশাসন। একইসঙ্গে তেহরানের প্রধান কবরস্থান 'বেহেশত-ই-জাহরা’-তে হাজার হাজার অতিরিক্ত কবর খুঁড়ে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

সংবাদপত্র 'ওয়েল্ট’-এর কাছে তেহরান পুরসভার এক কর্মী নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, শহরের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা দফতরে এমন প্রস্তুতি সত্যিই নেওয়া হচ্ছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উচ্চপর্যায় থেকে আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে প্রায় তিন হাজার মানুষের মৃত্যু হলেও যেন প্রশাসনিক কাজ সচল থাকে। এই চরম গরমে বিপুল জমায়েত সামলানো এক বড় অগ্নিপরীক্ষা।

সরকারি সূচি অনুযায়ী, তেহরানে গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া শেষকৃত্যের মূল আনুষ্ঠানিকতা কোম শহর হয়ে ইরাকের দুই পবিত্র শহর নজফ ও কারবালা অতিক্রম করবে। এরপর আগামী বৃহস্পতিবার ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পবিত্র শহর মাশহাদে আলি খামেনেইয়ের মরদেহ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কবর দেওয়ার কথা রয়েছে। এই দীর্ঘ সামগ্রিক যাত্রাপথের প্রতিটি ধাপে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ইরানের দীর্ঘ ইতিহাসে সাম্প্রতিক বছরগুলির মধ্যে এটিকে সবচেয়ে বড় লজিস্টিক বা যোগাযোগ ও সরবরাহ অভিযান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তেহরান শহরের মেয়র আলিরেজা জাকানির নেতৃত্বে প্রায় ১১ হাজার বিশেষ বাস নামানো হয়েছে রাস্তায়। শোভাযাত্রার যাত্রাপথ সুগম রাখতে ট্রাফিকের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ জারি করার পাশাপাশি তেহরানের মেট্রো এবং দ্রুতগামী বাস পরিষেবা সারাদিন চালু রাখা হচ্ছে।

প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকদের অনুমান, দেশের অন্যতম প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতার এই শেষবিদায়ের অনুষ্ঠানে প্রায় দুই কোটি ভক্তের সমাগম হতে পারে। ভিড় সামলাতে এবং দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষের অস্থায়ী আশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও স্থানীয় মসজিদগুলোকে সাময়িকভাবে থাকার জায়গায় রূপান্তরিত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি খাবারের জন্য তৈরি করা হয়েছে অসংখ্য লঙ্গরখানা।

এই বিশাল রাষ্ট্রীয় আয়োজনের পিছনে ইরান সরকার বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করেছে। তেহরানের প্রতিটি প্রশাসনিক জেলাকে এই তিন দিনের শেষকৃত্যের জন্য আনুমানিক পাঁচ লাখ থেকে সাড়ে ছয় লাখ ইউরো (ভারতীয় মুদ্র্যে যা প্রায় ৫ থেকে সাড়ে ৬ কোটি টাকা) দেওয়া হয়েছে। তবে এর মধ্যে দমকল বাহিনী বা অন্যান্য পার্কিং ও জরুরি পরিষেবার ব্যয় ধরা হয়নি।

ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিকদের থেকে জানা গিয়েছে, কেবল তেহরান শহরেই এই শেষকৃত্যের পেছনে খরচ হতে পারে প্রায় দেড় কোটি ইউরো বা ১৫০ কোটি টাকা। এছাড়া কোম এবং মাশহাদ শহরের প্রতিটিতে শেষকৃত্যের জন্য আরও প্রায় ৫০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এটিকে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম সবচেয়ে ব্যয়বহুল শেষকৃত্য বলা হচ্ছে।

ইরানে কোনও বড় রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিত্ব বা ধর্মীয় নেতার শেষকৃত্যের সময় বিশৃঙ্খলা ও প্রাণহানির ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০২০ সালে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত কুদস ফোর্সের কমান্ডার জেনারেল কাসেম সুলেমানির শেষকৃত্যে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল। কেরমান শহরে হওয়া সেই পদদলিত হওয়ার ঘটনায় অন্তত ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং আহত হয়েছিলেন প্রায় দু'শোর মানুষ।

ঠিক একইভাবে ১৯৮৯ সালে ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির শেষকৃত্য চলাকালীনও ঐতিহাসিক এক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল। লাখ লাখ শোকার্ত মানুষের অনিয়ন্ত্রিত উপস্থিতির কারণে সে সময় পদদলিত হয়ে অন্তত আটজন মারা যান এবং শত শত মানুষ গুরুতর জখম হন। সেই অপ্রীতিকর ও তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখেই এবার প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে।

বর্তমান সময়েও ইরানের চরম গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা এবং মরু জলবায়ুর কারণে সাধারণ মানুষের হিটস্ট্রোক বা ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে। প্রশাসন মনে করছে, অতীতের যেকোনও বিপর্যয় এড়াতে হলে আগে থেকেই সব ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আর সে কারণেই আগাম কবর তৈরি রাখার মতো কঠিন তবে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে প্রশাসন।

সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এই মহাপ্রয়াণ ও শেষকৃত্য আয়োজন অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। ধর্মীয় আবেগ ও রাষ্ট্রীয় আনুগত্য প্রদর্শন যেখানে চরম পর্যায়ে পৌঁছয়, সেখানে গণসুরক্ষা বজায় রাখা প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত দূরহ। লাখ লাখ মানুষের আবেগের এই মহাসমুদ্র সামলে শেষ পর্যন্ত বড় কোনও দুর্ঘটনা ছাড়াই এই শেষকৃত্য সম্পন্ন করাই এখন ইরানের আসল পরীক্ষা।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+