হরমুজ প্রণালী ফের অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করল ইরান, কিন্তু কেন?
পশ্চিম এশিয়ায় ফের ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের মেঘ। এবার বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর জ্বালানি সরবরাহ রুট হরমুজ প্রণালী অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করল ইরানের সামরিক বাহিনী। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্পাদিত সাম্প্রতিক চুক্তির শর্তপূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই কৌশলগত জলপথ অবরুদ্ধ থাকবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ইরানের শক্তিশালী ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আইআরজিসির তরফ থেকে সামুদ্রিক রেডিও চ্যানেলে প্রচারিত এক বিশেষ সতর্কবার্তায় বিশ্বের সমস্ত বাণিজ্যিক ও জ্বালানি তেলবাহী জাহাজকে এই এলাকা থেকে দূরে থাকার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইরানি সেনা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, সুরক্ষার স্বার্থেই যেন কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি না আসে। কোনো দেশ বা বাণিজ্যিক সংস্থা যদি এই নির্দেশ অমান্য করে ওই পথে যাওয়ার চেষ্টা করে, তবে তাদের ওপর সরাসরি সামরিক হামলা চালানো হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে সম্প্রতি এই প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল। তবে লেবাননে ইসরায়েল এবং হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে ভয়াবহ লড়াই শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আচমকা অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। এই সংঘাত তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সদ্য অর্জিত শান্তিকালীন সমঝোতাকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে এবং ইরান অভিযোগ করছে যে চুক্তির মূল শর্তগুলো লঙ্ঘন করা হচ্ছে।
ইরানের সামরিক কমান্ডের তরফ থেকে জারি করা বিবৃতিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়টি মূলত আমেরিকার প্রতিশ্রুতি পালনের ওপর নির্ভর করছে। ইরানের শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, লেবাননে ইসরায়েলের সমস্ত সামরিক অভিযানের অবসান ও সেখান থেকে তেল আবিবের সেনা প্রত্যাহার। এছাড়াও ইরানের ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা বা তেহরানের ভাষায় 'আমেরিকান জঙ্গি শক্তি'-র সম্পূর্ণ অপসারণ দাবি করেছে আইআরজিসি।
বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যতদিন পর্যন্ত না এই প্রধান দাবিগুলো মেনে নেওয়া হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত হরমুজের মতো আন্তর্জাতিক জলপথকে কোনোভাবেই ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। এই কূটনৈতিক ও সামরিক অনড় অবস্থানের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার পর তৈরিকৃত সমঝোতার পরিবেশ এখন চরম সংকটের মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, লেবানন সীমান্তে সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়ায় ইরান নিজেদের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্ত করতে এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে হরমুজ প্রণালীকে গোটা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের ধমনী বলা চলে। পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বারে অবস্থিত এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই বিশ্ব বাজারের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পরিবাহিত হয়। সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং কুয়েতের মতো প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো তাদের রপ্তানির জন্য এই রুটের ওপরই সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। ফলে এই পথ বন্ধ থাকার অর্থ হলো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এক বিপর্যয়কর ধাক্কা।
আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থাগুলো ইতিমধ্যেই তাদের জাহাজের রুট পরিবর্তন করার কথা গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করতে শুরু করেছে। তবে দীর্ঘ পথ ঘুরে আফ্রিকার ওপার দিয়ে ঘুরে ইউরোপ বা এশিয়ায় পৌঁছাতে গেলে জ্বালানি খরচ এবং সময় দুই-ই বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় অনেকটাই বেড়ে যেতে পারে, যার সরাসরি খেসারত দিতে হবে সাধারণ গ্রাহকদের। তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে নৌ-বীমা বা ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়ামও ইতিমধ্যে কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে।
ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য হরমুজ প্রণালীর এই অস্থিরতা মারাত্মক উদ্বেগের কারণ তৈরি করেছে। ভারত তার প্রয়োজনীয় পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সিংহভাগই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আমদানি করে থাকে। এই জলপথটি দীর্ঘকাল অবরুদ্ধ থাকলে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে পেট্রোল, ডিজেল ও রান্নার গ্যাসের দাম বিপুল পরিমানে বৃদ্ধি পাওয়ার সরাসরি আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়তে পারে।
ইরানের এই চরম সিদ্ধান্তের পর পেন্টাগন এবং ওয়াশিংটনের ডিফেন্স ডেস্ক গভীর উদ্বেগ ও তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ভেঙে মুক্ত বাণিজ্যের পথকে রুদ্ধ করছে ইরান, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তবে কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আমেরিকা এই মুহূর্তে সরাসরি কোনো বড় সামরিক সংঘর্ষে জড়াতে চাইছে না। ওয়াশিংটন এখনও তেহরানের সাথে আলোচনার মাধ্যমে বরফ গলানোর পথ খোলা রেখেছে এবং আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
অন্যদিকে, চিন, রাশিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোও এই সংকটের দ্রুত রাজনৈতিক সমাধান চেয়ে বিবৃতি প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলো, যারা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তারা এই উত্তেজনায় সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। বেজিংয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে হরমুজ প্রণালীর দীর্ঘমেয়াদী অচলাবস্থা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং সমগ্র এশিয়া ও ইউরোপীয় অঞ্চলের শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিতে পারে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্ব কূটনীতির ভবিষ্যৎ এখন একটি সুতোয় ঝুলছে। হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই জট ছাড়াতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য মধ্যস্থতায় আসতে হবে। দুই দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের নেওয়া পদক্ষেপের ওপরই এখন নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরবে নাকি বিশ্ব বাণিজ্য আরও এক ধ্বংসাত্মক মন্দার মুখে পড়বে। আপাতত জলপথের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য পর্দার আড়ালে এক নতুন কূটনৈতিক লড়াই শুরু হয়েছে।












Click it and Unblock the Notifications