ধপাস করিয়া পতন! উফ্, অরবিন্দ কেজরিওয়াল!

দু'টিরই উত্থান হুসহুসিয়ে, অথচ চোখের নিমেষে পুড়ে ছাই!
লোকসভা ভোটের আগে কিংবা ভোট চলাকালীন বারবার তিনি বলেছিলেন, বারাণসী থেকে গোহারা হারাবেন নরেন্দ্র মোদীকে। এটাও বলেছিলেন যে, নরেন্দ্র মোদীর জামানত জব্দ হবে। বাস্তবে কী হল, সারা দুনিয়া দেখল!
আসলে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের এই ভরাডুবি আকস্মিক নয়। সাড়া জাগিয়ে শুরু করেও কেন অবহেলিত অপাংক্তেয় হয়ে গেলেন, তা নিয়ে চর্চার প্রয়োজন বৈকি!
১. দিল্লির মুখ্যমন্ত্রিত্ব থেকে সরে যাওয়া
২০১২ সালের ২৬ নভেম্বর গঠিত হয়েছিল আম আদমি পার্টি। আর ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে দিল্লিতে বিধানসভা ভোটে ২৮টি আসন পেয়ে কংগ্রেসের সমর্থনে সরকার গঠন করেছিল তারা। যে কোনও সদ্যোজাত দলের কাছে ব্যাপারটা ঈর্ষণীয়, সন্দেহ নেই। কিন্তু ক্ষমতা দখলের ৪৯ দিন পর অরবিন্দ কেজরিওয়াল কী করলেন? জনলোকপাল বিল বিধানসভায় পেশ ও পাশ করাতে ব্যর্থ হয়ে দুম করে পদত্যাগ করলেন। আবেগতাড়িত না হয়ে যদি সেই সময় চুপ করে থেকে ভবিষ্যতে বিলটি পাশ করানোর কৌশল ঠিক করতেন, সেটা বরং বাস্তবসম্মত হত। যিনি এক সময় মানুষকে 'মুক্তির দিশা' দেখিয়েছিলেন, সেই তিনি এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দিল্লির জনগণ ক্ষুব্ধ হয়েছিল নিশ্চিতভাবেই। বারাণসীতে লোকসভা ভোটের প্রচারের সময় তাই তাঁকে স্বীকার করতেই হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেওয়া ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। যখন বুঝলেন, দেরি হয়ে গিয়েছিল।
২. সংগঠন না থাকা সত্ত্বেও বড় লড়াইয়ে নামা
রাজনীতিতে লড়াই কে কতটা জোরদার করতে পারবে, নির্ভর করে সংগঠনের ওপর। সংগঠন যত ভালো হবে, সংশ্লিষ্ট রাজনীতিক দল তত শক্তিশালী হবে। কংগ্রেস, সিপিএম, বিজেপি যে কোনও দলের দিকে তাকালেই ব্যাপারটা বোঝা যাবে। কিন্তু অরবিন্দ কেজরিওয়ালের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা উল্টো। আগে লড়াইটা শুরু করে দিলেন, তার পর সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করলেন। তাও সেই চেষ্টায় খামতি ছিল। পার্টির ক্যাডারদের চেয়ে মিডিয়ার ওপর অনেক অনেক বেশি নির্ভর করছিলেন। যতদিন মিডিয়ার ফোকাস ছিল, তিনি ছিলেন। যে-ই মিডিয়ার ফোকাস সরে গেল, তিনিও পুনর্মূষিকভব!
শক্তপোক্ত সংগঠন না থাকার কারণে দেখা গিয়েছে, আম আদমি পার্টির জমায়েতে সবাই রাজা! হইহল্লা, গুঁতোগুঁতি, বিশৃঙ্খলার চূড়ান্ত।
৩. বারাণসীতে ভোটারদের বিন্যাস বুঝতে ব্যর্থ
বারাণসী কিন্তু দিল্লি নয়। দিল্লি হল পোস্ট-ইন্ডাস্ট্রিয়াল সোসাইটি। খেয়াল করে দেখবেন, পরিষেবা ক্ষেত্রের সঙ্গে যারা যুক্ত (যেমন সফটঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, বিপিও কর্মী, ডাক্তার প্রমুখ), তারাই মূলত দিল্লিতে অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে সমর্থন করেছিল।
এখন প্রশ্ন হল, কেন? আগে দেখে নেওয়া যাক, পোস্ট-ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল সোসাইটি বা শিল্পোত্তর সমাজ কী? অর্থনীতিকে কৃষি এবং শিল্প এতদিন সচল রাখত। কিন্তু ইদানীং অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা পালন করছে পরিষেবা ক্ষেত্র বা সার্ভিস সেক্টর। ভারতে ২০১২ সালে মোট জিডিপি-র ৫৭ শতাংশ এসেছে পরিষেবা ক্ষেত্র থেকে। অন্যদিকে, উৎপাদন শিল্প বা ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর থেকে এসেছে জিডিপি-র ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ এখন অর্থনীতিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে পরিষেবা ক্ষেত্র। যে সমাজে চিরাচরিত উৎপাদন শিল্পের চেয়ে পরিষেবা ক্ষেত্র বড় হয়ে ওঠে এবং বেশি অর্থের জোগান দেয়, তাকে বলে পোস্ট-ইন্ডাস্ট্রিয়াল সোসাইটি বা শিল্পোত্তর সমাজ।
এই সমাজে পেশাদার মানুষজন শিক্ষিত, অনেক সচেতন। অথচ ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে সুযোগ কম, ঘুষ দিয়ে প্রাপ্য বাগিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বেশি। মানুষ যত শিক্ষিত হবে, এগুলো তত বেশি করে সে বুঝতে পারবে। টিভি-র রিমোট টিপলেই দেখবে কয়লা কেলেঙ্কারি, স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারির গল্প। কিন্তু সুরাহা না হলে ক্ষোভ ধূমায়িত হবে। শিল্পোত্তর সমাজের এটাই বৈশিষ্ট্য। সেই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে উত্থান হয়েছিল অরবিন্দ কেজরিওয়ালের।
"দেশ কা ইলেকশন হ্যায়, দিল্লি কা নেহি/ শের কা ইলেকশন হ্যায়, বিল্লি কা নেহি"
এখন দেখুন, বারাণসী সনাতন ভারতবর্ষ। দিল্লির মতো এখানকার সমাজ পোস্ট-ইন্ডাস্ট্রিয়াল সোসাইটি নয়। জাতপাতের ভিত্তিতে এখানে সমাজ বিভক্ত। নিরক্ষর মুটে, রিকশাচালক কয়লা কেলেঙ্কারি, স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারি নিয়ে ততটা ভাবিত নয়, যতটা ভাবিত দু'বেলা দু'মুঠো ভাত জোগাড় করা নিয়ে। নরেন্দ্র মোদী গুজরাতে কৃষকদের জমি কেড়ে নিয়ে মুকেশ আম্বানিকে দিলেন নাকি বিল গেটসকে, তাতে বারাণসীর একজন রিকশাচালক বা মুদিখানার দোকানদারের কী আসে যায়? দিল্লি যদি হয় পোস্ট-ইন্ডাস্ট্রিয়াল সোসাইটি, তা হলে বারাণসী হল প্রি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল সোসাইটি বা শিল্প-পূর্ববর্তী সমাজ। দু'টির আর্থ-সামাজিক ও মানসিক বিন্যাস আলাদা হবে, সেটাই স্বাভাবিক।
৪. গ্রামে কোনও প্রভাব নেই
দিল্লিতে সাময়িক সাফল্য পাওয়ার পর অরবিন্দ কেজরিওয়াল কোথায় গেলেন? ব্যাঙ্গালোর, মুম্বই, কলকাতা ইত্যাদি বড় শহরে। অর্থাৎ আম আদমি পার্টির কার্যকলাপ বড় বড় নগরেই সীমাবদ্ধ। মহাত্মা গান্ধী বলতেন, ভারতবর্ষের আত্মা গ্রামে বাস করে। খুব সত্যি কথা। অরবিন্দ কেজরিওয়াল নিজেই স্বীকার করেছেন, বারাণসীতে ভোটের প্রচারে গিয়ে অনেক মহল্লাতে ভোটারদের কাছে আগে নিজের পরিচয় দিতে হয়েছিল। তা হলে, গ্রামে কী অবস্থা সহজে অনুমেয়! এমন একটি শহরভিত্তিক দলের পক্ষে কি আদৌ লম্বা দৌড়ে টিকে থাকা সম্ভব ছিল?
৫. প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র এখন অচল, সেই মডেলে ঘেঁটে ঘ
তিনি মুখ্যমন্ত্রী হবেন কি হবেন না, কোন প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ করবেন, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে দিল্লির মহল্লায় মহল্লায় গণবৈঠক শুরু করলেন। এসএমএসে মতামত নিতে লাগলেন। ভেবে দেখেননি বা জেনেশুনেও বুঝতে চাননি, আজকাল এই প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের মডেল অচল। আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিক নগররাষ্ট্রগুলিতে এই মডেল চলত। প্রাচীন গ্রিসে এক-একটা নগর ছিল এক-একটা রাষ্ট্র। এদের বলা হত "পোলিস"। নগররাষ্ট্রগুলির জনসংখ্যা কোথাও ছিল এক হাজার, কোথায় তিন হাজার, কোথাও বা সাত হাজার।
ধরেই নিলাম, অরবিন্দ কেজরিওয়াল ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলেন! তখন কী করতেন? যে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ১২০ কোটি লোককে নিয়ে দরবার বসাতেন? এসএমএস পাঠানোর কথা বলতেন? এটাও কি সম্ভব? বিজেপি তাই ভোটের প্রচারে তাঁকে ব্যঙ্গ করে পোস্টার সেঁটেছিল, "দেশ কা ইলেকশন হ্যায়, দিল্লি কা নেহি/ শের কা ইলেকশন হ্যায়, বিল্লি কা নেহি।"
প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র পৃথিবীর সব দেশে এখন পরিত্যক্ত হয়েছে। সেই তামাদি মডেলকে আঁকড়ে ধরেছিলেন তিনি।
৬. কোনও বড় দলের সঙ্গে জোট না বাঁধা কৌশলগত ভুল
সাংগঠনিক শক্তি নেই, লড়ার ইচ্ছা ষোলো আনা। এই পরিস্থিতিতে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের উচিত ছিল কোনও বড় দলের সঙ্গে জোট বাঁধা। ধরা যাক, তিনি বিজেপি-র বিরুদ্ধে লড়তে চান। তা হলে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে শক্তি সঞ্চয় করে বিজেপি-র সঙ্গে লড়লে সুবিধা হত। তার পর যখন আম আদমি পার্টি নিজেরা পরাক্রমশালী হয়ে উঠত, তখন কংগ্রেসের সঙ্গ ছেড়ে তাদের বিরুদ্ধেই লড়লে সঠিক কাজ করত। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, কংগ্রেস ও বিজেপি-র বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনেই তো লড়াই শুরু করেছিলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তা হলে কংগ্রেসের সঙ্গ নেওয়া নীতিবিরুদ্ধ হত। বেশ! কিন্তু কংগ্রেসের সমর্থনে কেন তা হলে সরকার গড়েছিলেন? সেটা কি নীতিবিরুদ্ধ কাজ হয়নি?
৭. দুর্নীতি দূর করা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গিগত সমস্যা
দার্শনিক হেনরি বাকল একটি কথা বলেছিলেন, "সোসাইটি প্রিপেয়ার্স ক্রাইম, ক্রিমিনাল ওনলি কমিটস ইট।" অর্থাৎ সমাজই অপরাধের জন্ম দেয়, অপরাধী তা ঘটায় মাত্র।
ভারতের সমাজ আর্থিক বৈষম্যের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। সম্পদের যথাসম্ভব সুষম বণ্টন নেই। দুর্নীতি সেই কারণে। কাগজে-কলমে কয়েকটা আইন বানিয়ে দিলেই কি দুর্নীতি সমূলে উচ্ছেদ করা সম্ভব? সরকারে থেকে বরং সম্পদের যথাসম্ভব সুষম বণ্টনে তিনি জোর দিলে বাস্তবসম্মত কাজ হত। তার জন্য দরকার ছিল সুসংহত নীতি ও তার বাস্তবায়ন। সেটা না করে জনলোকপাল বিল পেশ করা নিয়ে দিল্লিতে যে কাণ্ড ঘটালেন, তাতে লোকের মনে হল, তিনি শুধুই প্রতিবাদী হতে জানেন, প্রশাসক নন। তাই পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল।
৮. পিছু ধাওয়া করার অভ্যাসেই শেষ
নরেন্দ্র মোদী বারাণসী থেকে দাঁড়াবেন বলে যখন বিজেপি ঘোষণা করল, অমনিই অরবিন্দ কেজিরওয়াল বললেন, তিনিও সেখান থেকে ভোটে লড়বেন। রাহুল গান্ধী আমেঠি থেকে লড়বেন, আম আদমি পার্টির কুমার বিশ্বাস তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পড়লেন। দলের সব্বারই এক অবস্থা। ফল কী হল? সবাই হেরে ভূত হলেন। আম আদমির কথা আপনারা বলেন বটে, কিন্তু তাদের কথা কি সত্যিই ভাবেন?
বাস্তবোচিত সিদ্ধান্ত এটাই হত, যদি হেভিওয়েটদের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে 'নিরাপদ' আসন থেকে অরবিন্দ কেজরিওয়ালরা লড়তেন। তা হলে লোকসভায় আম আদমি পার্টি কয়েকজন সাংসদ নিয়ে দাপট দেখাতে পারত। বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারকে চেপে ধরে সাধারণ মানুষের দাবি আদায় করা সম্ভব হত। হেভিওয়েটদের পিছু ধাওয়া করে নিজেদের নাক কেটে আখেরে আপনারা সাধারণ মানুষেরই ক্ষতি করলেন সবচেয়ে বেশি। ইতিহাসে 'পাগল' অথবা 'কার্টুন' হিসাবে আপনাদের স্থান হবে!
-
'১৫ দিন বাংলায় থাকব', ভবানীপুরে মমতাকে হারানোর ডাক, শাহের চ্যালেঞ্জে তপ্ত রাজনীতি -
কালিয়াচকে প্রশাসনিক গাফিলতি? জেলাশাসক, পুলিশ সুপারকে শোকজ, CBI অথবা NIA তদন্তের নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট -
ভবানীপুরে আজ শক্তি প্রদর্শনে বিজেপি, শুভেন্দুর মনোনয়নে সঙ্গী অমিত শাহ -
'খুব দ্রুত যুদ্ধ শেষ করব'! ইরান ইস্যুতে কড়া বার্তা মার্কিন প্রেসিডেন্টের, কী বললেন? -
কয়লা কেলেঙ্কারির তদন্ত! দেশের বিভিন্ন শহরে আই-প্যাকের দফতর ও ডিরেক্টরের বাসভবনে ইডি তল্লাশি -
কালিয়াচক কাণ্ডে কড়া বার্তা সুপ্রিম কোর্টের! 'রাজনীতি নয়, বিচারকদের নিরাপত্তাই...', কী কী বলল শীর্ষ আদালত? -
কালিয়াচক কাণ্ডে উত্তেজনা চরমে! বিচারকদের ঘেরাও-ভাঙচুরে তৃণমূলকে নিশানা সুকান্তর, কী বললেন দিলীপ? -
মালদহের অশান্তি নিয়ে বিজেপিকে কাঠগড়ায় তুলল মমতা, সুতির সভা থেকে শান্তির বার্তা -
৫৪ বছর পর চাঁদের পথে মানুষ, ৪ মহাকাশচারী নিয়ে নাসার 'আর্টেমিস ২'-এ ইতিহাসের নতুন অধ্যায় -
বসন্তের শেষে বাড়ছে পারদ! গরমে কী নাজেহাল হবে শহরবাসী? কী জানাচ্ছে হাওয়া অফিস? জানুন -
মালদহের ঘটনার তদন্তভার নিল সিবিআই, মমতার তোপে কমিশন -
ভোটার তালিকা ইস্যুতে ফের অগ্নিগর্ভ মালদহ, সকালে ফের অবরোধ












Click it and Unblock the Notifications