হিন্দু নন, কেরলের মন্দির উৎসবে অনুষ্ঠান বাতিল ভরতনাট্যম শিল্পীর, পোস্ট ফেসবুকে
হিন্দু নন, কেরলের মন্দির উৎসবে অনুষ্ঠান বাতিল ভরতনাট্যম শিল্পীর, পোস্ট ফেসবুকে
'হিন্দু নন’ এই অপরাধে কেরলের একটি মন্দিরে অনুষ্ঠান করতে বাধা দেওয়া হয় ২৭ বছরের এক ভরতনাট্যম শিল্পীকে। এক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে মানসিয়া ভিপি বলেন, 'ফোনের ওপাশ থেকে যেন আমায় বিবৃতি দেওয়া হল, যেখানে বলা হল হিন্দু নন যাঁরা তাঁদের মন্দিরে প্রবেশ নেই।’ মানসিয়া জানান তিনি কোনও ধর্মে বিশ্বাসী নন। তিনি বলেন, 'আমি জন্মেছি এবং বড় হয়েছি মুসলিম পরিবারে। কিন্তু এখন আমার কোনও ধর্ম নেই।’

মানসিয়ার ভরতনাট্যমের অনুষ্ঠান ছিল ২১ এপ্রিল কেরলের ত্রিশূর জেলার ইরিঞ্জালাকুড়ারের কুডালমাণিক্যম মন্দির উৎসবে। কিন্তু ২৭ মার্চ মন্দির কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে মানসিয়াকে ফোন করে জানায় যে তিনি এই উৎসবে অনুষ্ঠান করতে পারবেন না। মানসিয়া সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, 'এমনকী তাঁরা আমায় এও জিজ্ঞাসা করেন যে আমি আমার বিয়ের পর ধর্ম বদলেছি কিনা, আমার স্বামী এবং পরিবার হিন্দু কিন্তু আমার কোনও ধর্ম নেই।’
প্রসঙ্গত, মানসিয়ার বিয়ে হয়েছে বেহালাবাদক শ্যাম কল্যাণের সঙ্গে। তিনি জানান, নাচের প্রতি তাঁর আবেগের জন্য মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছিল। মানসিয়া বলেন, 'আপনার কল্পনার চেয়েও এটা খুবই কঠিন। আমরা (মানসিয়া ও তাঁর বোন রুবিয়া) রাস্তায় হাঁটলে লোকজন আমাদের গালিগালাজ করত এবং (আমাদের দিকে) বাজে কথা বলত। কেউ কেউ আমাদের ওপর হামলার চেষ্টাও করেছিল। আমার আত্মীয় এবং বন্ধুরা আমাকে বলেছিল যে আমি নরকে যাব কারণ আমি মঞ্চে নাচছি। আমরা কান্নাকাটি করতাম এবং আমাদের মা–বাবা আমাদের সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন যে আমাদের এইসব নিয়ে চিন্তা করা উচিত নয় কারণ আমরা কোনও ভুল করিনি। এখন আমি আপনাকে এটা বলতে পারছি। তখন আর কাউকে বলতে পারিনি।’
মানসিয়া জানান যে তিনি অধিকাংশ নাচের অনুষ্ঠান করেন মালাপ্পুরাম, পালাক্কাদ, কোট্টায়াম ও কান্নুর জেলার মন্দিরগুলিতে। তিনি কুডালমাণিক্যম মন্দির উৎসবে নাচ করতে পারবেন না বলে বেশ হতাশ হয়ে রয়েছেন। তবে তিনি বলেন, 'আমার ভরতনাট্যম, কথাকলি ও কুচিপুরির আরাঙ্গেট্রাম (মঞ্চে প্রথম নাচ) হয়েছিল ত্রিশুরের গুরুবায়ু মন্দিরের সামনে মেলাপাথুর অডিটোরিয়ামে।’ কিন্তু কুডালমাণিক্যম মন্দির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে এখানে মানসিয়ার নাচের অনুষ্ঠান হবে না কারণ মন্দিরে হিন্দু নন এমন মানুষের প্রবেশের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে।
কেরল সহ নয়টি রাজ্যের প্রায় ৮০০ জন শিল্পী মন্দিরে চত্ত্বরের ১২ একর জুড়ে একটি প্যান্ডেলে সংঘটিত কুডালমাণিক্যম নৃত্য ও সঙ্গীত উৎসবে অংশগ্রহণ করে। কুডালমাণিক্যম দেওয়াসোমের চেয়ারম্যান ইউ. প্রদীপ মেনন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, 'বর্তমান নিয়ম ও প্রবিধান অনুযায়ী আমরা অ–হিন্দুদের মন্দির চত্তবরে প্রবেশের অনুমতি দিতে পারি না।’ এমনকী এই মন্দিরের পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমে দেওয়া বিজ্ঞাপনেও উল্লেখ রয়েছে যে সমস্ত হিন্দু শিল্পীরা এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক তাঁরা তাঁদের প্রতিভার প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়ে দেখা করুন মন্দির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। তিনি এও জানান যে মানসিয়া মন্দির কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন যে তিনি কোনও ধর্মে বিশ্বাসী নন। মন্দির কমিটি তাঁকে স্পষ্ট করে দেয় যে তিনি হিন্দু নন তাই মন্দির চত্ত্বরে প্রবেশ করতে পারবেন না। তিনি আরও জোর দিয়েছিলেন যে কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কারও কাছ থেকে অভিযোগ পায়নি।
মানসিয়া আরও জানিয়েছেন, মাসখানেক আগে মন্দির কর্তৃপক্ষ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে। অনুষ্ঠানের জন্য মন্দির কর্তৃপক্ষ তাঁর নামও ছাপিয়েছিল। কিন্তু যেহেতু তিনি হিন্দু নন, তাই সেই অনুষ্ঠানে মানসিয়াকে অংশগ্রহণের অনুমতি দিতে রাজি হচ্ছেন না। এর পিছনে হিন্দুত্ববাদীদের চাপ রয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। ফেসবুকে মানসিয়া এ বিষয় নিয়ে পোস্টও করেছেন সম্প্রতি।
মানসিয়া কালিকট ইউনিভার্সিটির যুব উৎসবে সেরা মহিলা পারফর্ম্যারের জন্য দেওয়া একটি পুরস্কার কালাথিলকম জিতেছিলেন এবং তাঁর বোন রুবিয়া চিদাম্বরম আন্নামালাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভরতনাট্যমে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। প্রসঙ্গত, মালাপ্পুরম জেলার পুক্কত্তুরের আলাভিক্কুট্টি এবং আমিনার দুই কন্যা উভয় বোনই নাচের প্রতি তাঁদের আবেগ অনুসরণ করার জন্য তাঁদের সম্প্রদায়ের ক্রোধের মুখোমুখি হয়েছিল। মানসিয়ার কাছে তাঁর মা আমিনার মৃত্যু সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক তিনি বলেন, '১৫ বছর আগে মা মারা যান। ৪০ বছর বয়সে আমার মা ক্যান্সারে ভুগে মারা যান। আমরা ধর্মীয় গুরুদের কাছে মসজিদে মাকে কবর দেওয়ার জন্য অনুরোধ করি। কিন্তু যেহেতু আমরা, মানে আমি ও আমার বোন নাচ করি তাই মসজিদে মাকে কবর দেওয়া যাবে না। আমরা এরপর মায়ের আদিবাড়ির জায়গায় মাকে কবর দিই।’ মানসিয়া এও অভিযোগ করেন যে তাঁর পরিবারকে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, কুডালমাণিক্যম মন্দির হল দেশের একমাত্র প্রাচীন মন্দির যা রামের দ্বিতীয় ভাই ভরতকে উৎসর্গ করা হয়েছে। ঘটনাক্রমে, তাঁকে 'সঙ্গমেশ্বর’ যার অর্থ 'সঙ্গমের প্রভু’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়।












Click it and Unblock the Notifications