৭৫তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে জেনে নিন ভারতীয় ট্রেনের ইতিহাস
৭৫তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে জেনে নিন ভারতীয় ট্রেনের ইতিহাস
স্বাধীনতা দিবসের দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বন্দে ভারত ট্রেনের কথা ঘোষণা করেন। তিনি জানান, 'আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’ উপলক্ষ্যে ৭৫টি বন্দে ভারত ট্রেন ৭৫ সপ্তাহ ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সঙ্গে যোগস্থাপন করবে। ৭৫তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে নরেন্দ্র মোদী লালকেল্লায় বক্তব্য করার সময় এটি ঘোষণা করেন। তিনি এদিন এও জানান যে উড়ান স্কিম যেভাবে দেশের দূরবর্তী অঞ্চলগুলিকে সংযুক্ত করছে এবং যে গতিতে নতুন বিমানবন্দর তৈরি হচ্ছে তা অভূতপূর্ব।
দেশীয় পদ্ধতিতে তৈরি সেমি–গতিসম্পন্ন বন্দে ভারত ট্রেনের কমপক্ষে ১০টি চালু হবে ২০২২ সালের আগস্টে, যা ৪০টি শহরের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করবে। প্রধানমন্ত্রী এদিন উত্তরপূর্ব রাজ্যে রেল যোগাযোগের বিষয়েও কথা বলেন। ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতার ৭৫ বছর উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী মোদী ৭৫ বন্দে ভারত ট্রেন চালুর ঘোষণা করেন। এবার আসুন ভারতীয় রেলের গৌরবময় সফর এক নজরে দেখে নিই।
১৮৩২ সালে ভারতের জন্য প্রথম রেলপথের প্রস্তাব আসে মাদ্রাসে। যদিও ভারত তার প্রথম যাত্রীবাহী ট্রেন পায়। যা মুম্বইয়ের বোরি বন্দর থেকে থানে পর্যন্ত যেত। বোম্বাইকে (তখনকার দিনের মুম্বই) থানে, কল্যাণ এবং থাল এবং ভোর ঘাটের সঙ্গে সংযুক্ত করার জন্য রেলপথের ধারণাটি প্রথম বোম্বাই সরকারের প্রধান ইঞ্জিনিয়ার জর্জ ক্লার্কের কাছে ১৮৪৩ সালে ভাণ্ডুপ সফরের সময় এসেছিল। এর ২০ বছরের কম সময়ে আগেই ১৮৫৩ সালে ভারত প্রথম স্টিম ইঞ্জিন পায়। এই ট্রেন দিল্লি, বম্বে, কলকাতা ও মাদ্রাস এই চার প্রধান শহরে চালু ছিল। দেশের পার্বত্য রেলপথটি পরবর্তী ৫০ বছরে স্থাপন করা হয়েছিল। রেলপথ ভারতে প্রবেশের এক শতাব্দীরও কম সময়ের মধ্যে ভারতের নেটওয়ার্কে বার্ষিক হারে ৬০০ কিমি করে গোটা ভারতে ৫৪ হাজার কিমি রেলপথ গঠন করা হয়েছে। ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনের দিকে তাকিয়ে, ১৯০১ সালে রেলওয়ে বোর্ড গঠিত হয়।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের উপজাত হিসেবে জীবন শুরু করা সত্ত্বেও, স্বাধীনতার পর দেশকে সংজ্ঞায়িত ও রূপ দিতে ভারতীয় রেলওয়ে দ্রুত বিকশিত হয়। তবে ১৯৪৭ সালে, ব্রিটেন বিদায়ের সময় দেশকে দুই ভাগে বিভক্ত করে, যার ফলে রেলপথ জুড়ে ব্যাপক প্রভাব পড়ে কারণ ৪০% এরও বেশি নেটওয়ার্ক নতুন তৈরি পাকিস্তানের কাছে হারিয়ে যায়।

১৮৫৩–১৮৬৯ যাত্রীবাহী ট্রেনের সূচনা
রেল পরিষেবা ভারতে প্রাথমিকভাবে ১৯৩০ সালের আশেপাশে মাদ্রাসে প্রস্তাব আসলেও ইতিহাসবিদরা ১৬ এপ্রিল ১৮৫৩ সালকে ভারতের যাত্রীবাহী রেল বিপ্লবের কিক স্টার্টার হিসাবে উল্লেখ করেছেন। এই তারিখে দেশের প্রথম যাত্রীবাহী ট্রেন বম্বের বোরি বন্দর থেকে থানে পর্যন্ত ৩৪ কিমির যাত্রা অতিক্রম করবে। সাহিব, সিন্ধ ও সুলতান নামের তিনটি লোকোমোটিভ কর্তৃক চালিত এই রেল পরিষেবা ৪০০ জন যাত্রী বহন করতে পারত। যাত্রী ভ্রমণের এই প্রাথমিক যুগে প্রাথমিকভাবে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের তৈরি গ্যারান্টি সিস্টেমের অধীনে বেসরকারি কোম্পানিগুলি অর্থায়ন করেছিল, যা নিশ্চিত করেছিল যে তারা তাদের মূলধন বিনিয়োগে নির্দিষ্ট হারে সুদ পাবে। ১৮৫৫ থেকে ১৮৬০ সালের মধ্যে আটটি রেল সংস্থা গঠন হয়, যার মধ্যে ইর্স্টান ইন্ডিয়া রেলওয়ে, গ্রেট ইন্ডিয়া পেনিনসুলা সংস্থা, মাদ্রাস রেলওয়ে, বম্বে বরোদা ও সেন্ট্রাল ইন্ডিয়া রেলওয়ে উল্লেখযোগ্য।

১৯০১ থেকে ১৯২৫: কেন্দ্রীকরণের দিকে পদক্ষেপ
বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে ভারতে ব্রড, ন্যারো ও মিটার গেজ নেটওয়ার্কে একাধিক মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন রেল পরিষেবা চালু হয়ে যায়। ১৯০০ সালে সরকার জিআইপিআর নেটওয়ার্কটি অধিগ্রহণ করে নেয়। তবে ব্যবস্থাপনা কোম্পানির পরিচালনাতেই চলতে থাকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ঘোষিত হলে যুক্তরাজ্য, মেসোপটেমিয়া, পূর্ব আফ্রিকা প্রভৃতি অঞ্চলে প্রেরণের জন্য রেলপথে সেনা ও খাদ্যশস্য প্রেরিত হয় বোম্বাই ও করাচি বন্দর নগরের উদ্দেশ্যে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে ভারতে রেল ব্যবস্থা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯২৩ সালে জিআইপিআর ও ইআইআর কোম্পানি দুটির রাষ্ট্রায়ত্ত্বকরণ করা হয়। সরকার এই দুই কোম্পানির পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণের ভার সম্পূর্ণ নিজের হাতে গ্রহণ করে।

১৯২৫–১৯৪৬: বৈদ্যুতিন ও কঠিন সময়
ভারতের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু হয়েছিল ১৯২৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি, যার নাম এক্স-গিপ রেলওয়ে। এই ট্রেনটির রুট ছিল মুম্বই-এর ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস থেকে কুরলা হারবার পর্যন্ত। তবে পরে এই ইলেকট্রিক ট্রেন লাইনটি নাসিকের ইগৎপুরি জেলা এবং পরে পুনেতে প্রসারিত করা হয়।

১৯৫১: জোন সহ রেল নেটওয়ার্ক প্রতিস্থাপন
১৯৫১ সালে বিদ্যমান রেল ব্যবস্থাটি পরিত্যক্ত হয় এবং জোন বা অঞ্চল ব্যবস্থা চালু হয়। ১৯৫২ সালে ভারতে ছয়টি রেল অঞ্চল স্থাপিত হয়। বর্তমানে রেলের ১৮টি জোনাল রেলওয়ে রয়েছে। ১৯৮৫ সালে স্টিম লোকোমোটিভ বন্ধ হয়ে যায় এবং বৈদ্যুতিন ও ডিজেলে চলা ট্রেন তার বদলে আসে।

১৯৮০–২০০০: প্রযুক্তি ও স্টিম ট্রেন বন্ধ হওয়া
১৯৮০ সালে স্টিম লোকোমোটিভ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভারতের অর্থনীতি সমৃদ্ধির মুখ দেখার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের রেলওয়ে উৎপাদনের পুরোটাই দেশে উৎপাদিত হতে থাকে। ১৯৮৫ সালে স্টিম ইঞ্জিনের বদলে ডিজেল ও বৈদ্যুতিন লোকোমোটিভ চালু করা হয়। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে রেলওয়ের সংরক্ষণ ব্যবস্থার পুরোটাই সুনিয়ত ও কম্পিউটারায়িত করা হয়। এই সময় ১৯৮৪ সালে কলকাতায় প্রথম মেট্রো রেল চালু হয়। ৯০ সালে কঙ্কোন রেল চালু করা হয়। ৭৩৮ কিলোমিটার রেলপথ ভারতের পশ্চিম উপকূলকে দেশের অন্যান্য অংশের সঙ্গে সংযুক্ত করে।

২০০০–২০০১: অনলাইন পরিষেবা
২০০০ সাল থেকে মেট্রো স্টেশনগুলি দেশের প্রধান প্রধান শহরে গড়ে উঠছে, যার মধ্যে দিল্লি (২০০২), বেঙ্গালুরু (২০১১), গুরুগ্রাম (২০১৩) এবং মুম্বই (২০১৪)। নব্বই দশক থেকে শুরু করে ২০০২ সাল পর্যন্ত নেটওয়ার্কের পূর্ব উপকূল, দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল, দক্ষিণ পূর্ব মধ্য, উত্তর মধ্য ও পশ্চিম মধ্য রেলওয়ে অঞ্চল তৈরি করা হয়েছিল। ২০০২ সালে আইআরসিটিসি পদ্ধতির মাধ্যমে অনলাইনে টিকিট বুকিংও শুরু করে দেওয়া হয়। যাত্রীরা এখন তাদের যাত্রা অনলাইনে বুক করতে পারেন বা সারা দেশের হাজার হাজার এজেন্টের কাছ থেকে টিকিট কিনতে পারেন, এটি একটি প্রয়োজনীয় সংযোজন। বলা হয় যে যাত্রীরা ২০০০-২০০১ সালের সময়কালে রেলপথে ৪.৫ বিলিয়ন কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করেছিলেন।

ভারতীয় রেলের পরিকাঠামো
ভারতীয় রেল কোনো প্রাইভেট কোম্পানি নয়। এটি ভারত সরকারের রেল মন্ত্রক কর্তৃক অধিগৃহীত ও পরিচালিত একটি বিভাগীয় সংস্থা। একজন রেল মন্ত্রকের কেন্দ্রীয় পূর্ণমন্ত্রীরূপে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। দুই জন রাষ্ট্রমন্ত্রী রেলমন্ত্রীকে সহায়তা করে থাকেন। ভারতীয় রেলের প্রশাসনের দায়িত্বে রয়েছে এক অর্থ কমিশনার, পাঁচ সদস্য ও এক চেয়ারম্যান বিশিষ্ট রেলওয়ে বোর্ড। এর যাবতীয় খরচ ভারতীয় সংসদ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ১৯২৪ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সাধারণ বাজেটের দুই দিন আগে রেল বাজেট পেশ হত।

বন্দে ভারত এক্সপ্রেস
ভারতের সবচেয়ে দ্রুতগতি সম্পন্ন হল বন্দে ভারত এক্সপ্রেস অথবা ট্রেন ১৮। এই ট্রেনটির গতিবেগ প্রায় ১৮০ কিলোমিটার/ঘণ্টা কিন্তু ট্রায়ালের পর সুরক্ষার উদ্দেশ্যে এই ট্রেনটির গতিবেগ ১৩০ কিলোমিটার/ঘণ্টার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করা হয়। আমাদের দেশের এই দ্রুততম ইঞ্জিনহীন স্বচালিত ট্রেনটি চালু হয় ২০১৯ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি এবং এই ট্রেনটির রুট হল নিউ দিল্লি থেকে বারানসি পর্যন্ত।

নীলগিরি এক্সপ্রেস
ভারতের সবচেয়ে ধীরগতি সম্পন্ন ট্রেন হল নীলগিরি এক্সপ্রেস। যার গতিবেগ প্রায় ১০ কিলোমিটার/ঘণ্টা অর্থাৎ ট্রেনটি ১৫ ঘণ্টায় মাত্র ৪০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে।

দীর্ঘতম রেল স্টেশন
বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে দীর্ঘতম রেল স্টেশন হলো উত্তরপ্রদেশের গোরখপুর রেলস্টেশন যা ১৩৬৬ মিটার দীর্ঘ।












Click it and Unblock the Notifications