Manmohan Singh: "অগ্রগণ্য নীতিনির্ধারক হিসেবেই চিরস্মরণীয় থাকবেন মনমোহন," লিখলেন অর্থনীতিবিদ ডঃ প্রসেনজিৎ বসু
Manmohan Singh: ৯২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। বৃহস্পতিবার দিল্লির এইমস হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। আর্থিক উন্নয়নের ভগীরথ মনমোহনের প্রধানমন্ত্রিত্বের শেষকাল ততটাই সমালোচিত। রোদ ঝলমলে মনমোহন জমানায় যেন শৈবালের আস্তরণ পড়ে গিয়েছিল। এনিয়ে ওয়ানইন্ডিয়া বাংলা কথা বলেছিল অর্থনীতিবিদ ডঃ প্রসেনজিৎ বসুর সঙ্গে। প্রশ্নের উত্তরে কী লিখলেন তিনি দেখে নেওয়া যাক।
প্রশ্নঃ মনমোহন সিং-এর আমলে অর্থনৈতিক সংস্কার প্রক্রিয়াকেই কি আজকের সম্ভাবনাময় ভারতের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে দেখা উচিৎ?
উত্তরঃ হ্যাঁ অবশ্যই। বিংশ শতাব্দীর শেষ অর্ধে তৃতীয় বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে বিশ্বজুড়ে তাত্ত্বিক এবং নীতিগত বিতর্ক চলে। তৃতীয় বিশ্বের সব থেকে জনবহুল দুই দেশ, চীন এবং ভারতে, এই বিতর্কের প্রাসঙ্গিকতা ছিল সর্বাধিক। চীনে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি থেকে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত কিন্তু বাজারমুখী অর্থনীতির বিবর্তন আসে ১৯৭৮ সালের পরে, দেং শিয়াও পিং-এর তত্ত্বাবধানে। ১৯৯১ সালে থেকে ভারতে বাজারমুখী অর্থনীতির অভিমুখে বিবর্তনের মূল রূপকার ছিলেন ড. মনমোহন সিং।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে ড. মনমোহন সিং-এর নিজস্ব চিন্তাভাবনার মধ্যেও বিবর্তন লক্ষণীয়। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা থাকাকালীন মনমোহন সিং নেহরুর সমাজতান্ত্রিক মিশ্র অর্থনীতিতেই বিশ্বাসী ছিলেন। আশির দশকে বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যে বড় পরিবর্তন ঘটেছিল, ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর এবং যোজনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান থাকাকালীন মনমোহন সিং সেগুলি খুবই কাছের থেকে দেখেছিলেন এবং গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন। ১৯৮৭ সালে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের (NAM) উদ্যোগে তানজানিয়ার রাষ্ট্রপতি জুলিয়াস নাইরেরের সভাপতিত্বে যে "সাউথ কমিশন" গঠিত হয়, ড. মনমোহন সিং ছিলেন তার সাধারণ সম্পাদক। ১৯৯০ সালে প্রকাশিত সেই সাউথ কমিশনের রিপোর্টে উন্নয়নশীল দেশসমূহে বাজার অর্থনীতির কার্যকারিতার সাথে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে একইসাথে অবলম্বন করে চলার দিশা দেখানো হয়। এই রিপোর্টের দৃষ্টিভঙ্গিতে ড. মনমোহন সিং-এর চিন্তাভাবনার ছাপ স্পষ্ট।
১৯৯১ সালে নরসিংহ রাও সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে মনমোহন সিং যে অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির সূচনা করেন, তার ফলে একদিকে অর্থনীতিতে ব্যক্তিগত পুঁজি বিনিয়োগ এবং বাণিজ্যের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণগুলি একে একে শিথিল করে দেওয়া হয়; অন্যদিকে পণ্য ও পরিষেবার আমদানি-রপ্তানি এবং বিদেশি বিনিয়োগের বিধিনিষেধ তুলে দিয়ে ভারতের অর্থনীতিকে বিশ্ব বাজারের সাথে সংযুক্ত করা হয়। এই অর্থনৈতিক সংস্কার প্রক্রিয়া সূচনার পর তিন দশক অতিক্রান্ত। এই তিন দশকে ভারতে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার স্বাধীনোত্তর প্রথম তিন-চার দশকের তুলনায় লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে এবং ভারত আজ বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলির মধ্যে নিজের জায়গা করে নিয়েছে। এই সাফল্যের পিছনে ড. মনমোহন সিং-এর নীতিগত অবদান যে সর্বোচ্চ, তা অনস্বীকার্য।
প্রশ্নঃ ২০০৮-২০০৯ সালে বিশ্বজুড়ে মহামন্দার আঁচ ভারতে যে সেভাবে পড়েনি, এখানে মনমোহন সিংয়ের কৃতিত্ব কতটুকু?
উত্তরঃ ২০০৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে আর্থিক সঙ্কট দেখা দেয়, তার ফলেই ২০০৯ সালে গোটা বিশ্বে মন্দা নেমে আসে। এই আর্থিক সঙ্কটের পিছনে মূল কারণ ছিল রিয়েল এস্টেট, বন্ধকী ঋণ এবং শেয়ার বাজারে ফিনান্স পুঁজির বল্গাহীন ফাটকাবাজি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সব থেকে বড় বেসরকারি ব্যাঙ্ক এবং বীমা সংস্থাগুলি এই ফাটকাবাজিতে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আর্থিক বুদবুদ ফেটে গিয়ে যে মন্দা আসে, বিশ্বায়িত বাজার অর্থনীতিতে সেই মন্দা বিশ্বমন্দায় পরিণত হয়।
ভারতে ২০০৯ সালের মহামন্দার প্রভাব তুলনামূলক ভাবে অনেক কম পড়েছিল, তার প্রধান কারণ দুটো। প্রথমত ভারতের ব্যাঙ্ক-বীমা ক্ষেত্রে উদারীকরণের পরেও রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের ভূমিকা বেসরকারি সংস্থাগুলির তুলনায় অনেক বড় থেকেছে। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া, ভারতীয় জীবন বীমা নিগম এখনো ভারতের সব থেকে বড় ব্যাঙ্ক এবং বীমা কোম্পানি। রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক ক্ষেত্র দুর্নীতিমুক্ত না হলেও এখানে ফাটকাবাজি, ব্যক্তিগত লোভ ইত্যাদির প্রবণতা কম। ভারতে বাজারমুখী উদারীকরণ সত্ত্বেও ব্যাঙ্ক-বীমার মতন স্ট্রাটেজিক ক্ষেত্রে সফল রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিকে বেসরকারিকরণ না করার সিদ্ধান্তের কৃতিত্ব খানিকটা মনমোহন সিংয়ের প্রাপ্য, কিন্তু এই ক্ষেত্রে বামপন্থী দল এবং ট্রেড ইউনিয়নগুলির ভূমিকাকে বেশি কৃতিত্ব দেওয়া উচিৎ।
দ্বিতীয়ত, ২০০৯ সালের মন্দার প্রেক্ষিতে বিশ্বজুড়ে নয়াউদারবাদী ফর্মুলার বিপরীতে হেঁটে বাজেট ঘাটতি বাড়িয়ে ঘরেলু বাজারকে চাঙ্গা করার কেয়ন্সীয় দাওয়াই প্রয়োগ করা হয়। ভারতেও ওই সময়ে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সরকার মন্দা রোধে অনেকগুলি পদক্ষেপ নিয়েছিল, জনকল্যাণমুখী প্রকল্পে খরচ এবং সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে। এর কৃতিত্ব অনেকটাই মনমোহন সিংয়ের প্রাপ্য। আসলে বাজারমুখী সংস্কারের প্রবক্তা হলেও নীতি নির্ধারক হিসেবে মনমোহন সিং বাস্তববাদী ছিলেন, এবং বাজার অর্থনীতির সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধেও তিনি সচেতন ছিলেন।
প্রশ্নঃ অর্থমন্ত্রী মনমোহন বনাম প্রধানমন্ত্রী মনমোহনকে কীভাবে তুলনা করবেন?
উত্তরঃ ড. মনমোহন সিং কেমব্রিজ থেকে প্রথম শ্রেণিতে ট্রাইপস উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৬৪-তে অক্সফোর্ড থেকে অর্থনীতিতে ডক্টরেট ডিগ্রি পান। ভারতের রপ্তানির গতিপ্রকৃতি নিয়ে ছিল তাঁর ডক্টরাল থিসিস, যা পরিবর্তিতে বই হিসেবে প্রকাশিত হয়। চণ্ডীগড়ের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় এবং দিল্লি স্কুল অফ ইকনমিক্সে অধ্যাপনাও করেন বেশ কয়েক বছর। ১৯৭১ সালে বিদেশি বাণিজ্য মন্ত্রকে উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকে ভারতের আর্থিক নীতিনির্ধারণের এমন কোন শীর্ষ পদ নেই যা মনমোহন সিং সামলাননি। ভারতের একজন অগ্রগণ্য নীতিনির্ধারক হিসেবেই উনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
২০০৪ থেকে ২০১৪, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দশ বছর উনি যে ব্যক্তিগত সততা, নিষ্ঠা এবং বিনম্রতার সাথে অক্লান্তভাবে কাজ করে গেছেন, সেকথা ওনার বিরোধীরাও একবাক্যে স্বীকার করবেন। কিন্তু যে বাজারমুখী অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রবর্তন উনি করেছিলেন, তার কুপ্রভাবগুলি তাঁর নেতৃত্বে চলা সরকারের শেষদিকে বড্ড প্রকট হয়ে ওঠে - বড়মাত্রায় কর্পোরেট দুর্নীতি, বেলাগাম মূল্যবৃদ্ধি, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের অপাত্রে ঋণদান এবং অনুৎপাদক সম্পদবৃদ্ধি এবং সর্বোপরি, ধনী এবং দরিদ্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান আয় এবং সম্পদের বৈষম্য। মনমোহন সিংয়ের অনেক সাফল্যের পাশাপাশি এই নেতিবাচক দিকগুলিও ওনার উত্তরাধিকার হিসেবেই চিহ্নিত থাকবে।
-
ভবানীপুর ও নন্দীগ্রামে উত্তাপ চরমে, শুভেন্দুর বিরুদ্ধে ভয়ের রাজনীতির অভিযোগে মনোনয়ন বাতিলের দাবি তৃণমূলের -
ইডেনে প্রথম জয়ের সন্ধানে কেকেআর-সানরাইজার্স, দুই দলের একাদশ কেমন হতে পারে? -
যুদ্ধ নয়, আলোচনায় সমাধান! হরমুজ ইস্যুতে বৈঠক ডাকল ব্রিটেন, যোগ দিচ্ছে ভারত -
কালিয়াচক কাণ্ডে কড়া বার্তা সুপ্রিম কোর্টের! 'রাজনীতি নয়, বিচারকদের নিরাপত্তাই...', কী কী বলল শীর্ষ আদালত? -
ভোটার তালিকা ইস্যুতে ফের অগ্নিগর্ভ মালদহ, সকালে ফের অবরোধ -
মালদহের ঘটনার তদন্তভার নিল সিবিআই, মমতার তোপে কমিশন -
ভোটের আবহে জলপাইগুড়িতে চাঞ্চল্য, এক্সপ্রেস ট্রেনে জাল নথি সহ ১৪ বাংলাদেশি গ্রেপ্তার, তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা -
'১৫ দিন বাংলায় থাকব', ভবানীপুরে মমতাকে হারানোর ডাক, শাহের চ্যালেঞ্জে তপ্ত রাজনীতি -
কয়লা কেলেঙ্কারির তদন্ত! দেশের বিভিন্ন শহরে আই-প্যাকের দফতর ও ডিরেক্টরের বাসভবনে ইডি তল্লাশি -
কালিয়াচকে প্রশাসনিক গাফিলতি? জেলাশাসক, পুলিশ সুপারকে শোকজ, CBI অথবা NIA তদন্তের নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট -
৫৪ বছর পর চাঁদের পথে মানুষ, ৪ মহাকাশচারী নিয়ে নাসার 'আর্টেমিস ২'-এ ইতিহাসের নতুন অধ্যায় -
'মালদহ কাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড' মোফাক্কেরুল ইসলাম গ্রেফতার, পালানোর সময় বাগডোগরা থেকে ধৃত












Click it and Unblock the Notifications