০-২ গোলে পিছিয়ে থেকেও অবিশ্বাস্য জয়! মেসি-জাদুতে কোয়ার্টার ফাইনালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা

ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ১৬র মঞ্চে এক অবিশ্বাস্য এবং মহাকাব্যিক রূপকথার জন্ম হল। আটলান্টা স্টেডিয়ামে মিশরকে ৩-২ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা (Argentina)। ম্যাচের একটা সময় ০-২ গোলে পিছিয়ে পড়ে যখন চরম বিপর্যয়, ঠিক তখনই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ভক্তদের আশার আলো দেখালেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। পেনাল্টি মিসের শঙ্কা উড়িয়ে দুর্দান্ত প্রতাবর্তন ঘটাল বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

বিশ্বকাপ ফুটবলের সুদীর্ঘ ইতিহাসে আর্জেন্টিনা এর আগে কখনও দুই গোলের ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পর ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচ জয়ের কৃতিত্ব দেখাতে পারেনি। মিশরের বিপক্ষে এই লড়াই তাই আলবিসেলেস্তেদের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। মাত্র চার মিনিটে ম্যাচের চালচিত্র যেভাবে উল্টে গেল, তা ফুটবল পণ্ডিতদেরও অবাক করেছে। পরাজয়ের দোরগোড়া থেকে দলকে টেনে তুলে মেসি আরও একবার বুঝিয়ে দিলেন কেন তিনি ফুটবলের আসল জাদুকর।

Lionel Messi celebrates Argentina s historic World Cup comeback victory

ম্যাচের শুরু থেকেই দুর্দান্ত ফুটবল খেলা মিশর একের পর এক আক্রমণে কোণঠাসা করে ফেলেছিল আর্জেন্টাইন রক্ষণকে। আলবিসেলেস্তেদের ডিফেন্সের বোঝাপড়ার দুর্বলতাকে কাজে নিয়ে ম্যাচের ১৫ মিনিটের মাথায় প্রথম গোল করে মিশরকে এগিয়ে দেন ডিফেন্ডার ইয়াসের ইব্রাহিম। ডানদিক থেকে আসা চমৎকার এক হেড পরাস্ত করে আর্জেন্টাইন গোলরক্ষককে। আকস্মিক এই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই মাঝমাঠের দখল হারিয়ে ধুঁকতে শুরু করে আর্জেন্টিনা।

পেনাল্টি মিসের হতাশা ও দ্বিতীয় গোলের ধাক্কা

প্রথমার্ধেই আর্জেন্টিনার সামনে সমতা ফেরানোর সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল। মিশরের বক্সে ফাউল করা হলে রেফারি আর্জেন্টিনার পক্ষে পেনাল্টির নির্দেশ দেন। কিন্তু স্পট কিক নিতে এসে সবাইকে হতাশ করেন ফুটবল জাদুকর। মিশরের তরুণ তুর্কি গোলরক্ষক মোস্তফা শোবের অসাধারণ অনুমানশক্তি ও দক্ষতায় মেসির শটটি রুখে দেন। এই পেনাল্টি হাতছাড়া হওয়ার তীব্র যন্ত্রণা মেসি এবং দলের খেলার ওপর সাময়িক প্রভাব ফেলেছিল।

বিরতির পরে খেলার মাঠে নাটকীয়তা আরও বৃদ্ধি পায়। ম্যাচের ৫৬ মিনিটে মোস্তফা জিকোর একটি দুর্দান্ত গোল প্রথমে অফসাইডের কারণে ভিএআর (VAR) প্রযুক্তির সাহায্যে নাকচ করে দেন রেফারি। কিন্তু তাতেও দমে যায়নি মিশরীয় ফুটবলাররা। এই ঘটনার ঠিক দশ মিনিট পরে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের ভুল বোঝাবুঝির পুরো ফায়দা তুলে জিকো পুনরায় লক্ষ্যভেদ করেন। এবার গোলের সিদ্ধান্ত সুরক্ষিত থাকলে ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা।

খেলার বড় একটা সময় পর্যন্ত মিশরের এমন অপ্রতিরোধ্য দাপটে মনে হচ্ছিল বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিদায় এবার নিশ্চিত। কিন্তু ম্যাচের ঠিক ৭৮ মিনিটে রচিত হয় আর্জেন্টিনার ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস। ডানদিক থেকে লিওনেল মেসির নেওয়া এক চোখধাঁধানো ক্রস প্রতিপক্ষের বক্সের বুক চিরে উড়ে আসে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর মাথায়। এক মাপা হেডে বল আর্জেন্টিনার জালে প্রথম আলো দেখায় এবং স্কোর কমে দাঁড়ায় ২-১ ব্যবধানে।

রোমেরোর সেই গোলের রেশ কাটতে না কাটতেই ম্যাচের ৮২ মিনিটে পুরো স্টেডিয়াম মেতে ওঠে মেসির অবিস্মরণীয় ম্যাজিকে। মিশরীয় রক্ষণভাগের ফুটবলারদের অনায়াসে বোকা বানিয়ে বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে দুর্দান্ত গোল করেন খোদ মেসি। ২-২ সমতা আনার পাশাপাশি মেসি চলতি টুর্নামেন্টে নিজের অষ্টম গোলটি পেয়ে যান। এর মাধ্যমে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার আগে যাওয়ার পাশাপাশি বিশ্বকাপে টানা নয় ম্যাচে গোল করার রেকর্ড গড়েন তিনি।

এনজো ফার্নান্দেজের জয়সূচক গোল ও শেষ আটের রোমাঞ্চ

ম্যাচে যখন সমতা ফিরে এসেছে, তখন শেষ মুহূর্তের মানসিক চাপ মোকাবিলার নাটকীয় সংগ্রাম চলছিল দুই দলের মধ্যে। খেলা অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর ঠিক আগ মুহূর্তে, অর্থাৎ ৯২ মিনিটে কর্নার থেকে উড়ে আসা বলকে লক্ষ্য করে লাফিয়ে ওঠেন এনজো ফার্নান্দেজ। অসাধারণ টাইমিংয়ে তাঁর নেওয়া হেডটি সোজা মিশরের জালে আশ্রয় নেয়। ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা আর্জেন্টিনা মুহূর্তের মধ্যে ৩-২ ব্যবধানে জয়ের নতুন রূপকথা লিখে ফেলে।

মিশরের এমন বীরত্বপূর্ণ লড়াই এবারের বিশ্বকাপে অত্যন্ত প্রশংসিত হচ্ছে। ফুটবল ইতিহাসে এর আগে তারা কখনও বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিতে পারেনি। এদিন ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিট পর্যন্ত তাদের জয় প্রায় নিশ্চিত মনে হচ্ছিল। কিন্তু স্নায়ুর চাপ এবং শেষ মুহূর্তের অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক মনোভাবের বড় খেসারত দিতে হলো তাদের। মেসির মতো গতিশীল তারকা যে মুহূর্তেই ব্যবধান গড়ে দিতে পারেন, তা প্রমাণ হলো আরও একবার।

ম্যাচ পরিচালনায় কোচ লিওনেল স্কালোনির নেওয়া কিছু সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে দারুণ কার্যকর ভূমিকা রাখে। আর্জেন্টিনার মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগ যেভাবে ম্যাচের শেষভাগে দুর্দান্ত ছন্দ খুঁজে পেয়েছিল, তা কোচের সুনিপুণ প্ল্যানিংয়ের প্রমাণ দেয়। পেনাল্টি মিস করার পরেও অধিনায়ক মেসিকে যেভাবে বাকি ফুটবলাররা সাহায্য করেছেন এবং লড়াকু ফুটবল খেলেছেন, তা দলের ঐক্য ও দুর্দান্ত বন্ডিংয়ের কথাই বলে।

আর্জেন্টিকার এই নাটকীয় জয় তাদের টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ট্রফি ঘরে তোলার আকাঙ্ক্ষাকে আরও জোরালো করে তুলল। কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করার মাধ্যমে দলটির মানসিক বলিয়ান অনেক দূর এগিয়ে গেছে। ম্যাচের চরম সংকটময় পরিস্থিতি থেকে ফিরে আসার যে আত্মবিশ্বাস আর্জেন্টিনা এই ম্যাচে পেল, তা টুর্নামেন্টের সামনের কঠিন দিনগুলোতে বাকি বড় দলগুলোর বিপক্ষে তাদের অনেক বেশি এগিয়ে রাখবে ও বাড়তি অনুপ্রেরণা জোগাবে।

আটলান্টার এই ম্যাচটি কেবল শেষ ষোলোর কোনো দ্বৈরথ হিসেবে সীমাবদ্ধ রইল না, এটি ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় এক লড়াই হিসেবে গেঁথে থাকবে। মিশর দুর্দান্ত লড়েও বিদায় নিল, তবে তাদের এই লড়াই শ্রদ্ধার দাবি রাখে। অন্যদিকে মেসির আর্জেন্টিনা প্রমাণ করল যে কঠিন পরিস্থিতি যতই আসুক না কেন, চ্যাম্পিয়নরা কখনও হাল ছাড়ে না। শেষ আটের লড়াইয়ের আগে দলটির প্রতি বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা আরও বহুগুণ বেড়ে গেল।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+