শেফালি ফাইনালের ও দীপ্তি টুর্নামেন্টের সেরা, বিশ্বকাপ জয়ে অমল-আলোয় উদ্ভাসিত ভারতের মহিলা ক্রিকেট
হরমনপ্রীত কৌরের ভারত মেয়েদের ক্রিকেটে যে কোনও ফরম্যাটে এই প্রথম বিশ্বকাপ জিতল। গ্রুপ পর্বের শীর্ষে থাকা অস্ট্রেলিয়াকে সেমিফাইনালে হারানোর পর দুইয়ে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকাকে ফাইনালে হারিয়ে।
অমল মুজুমদার দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রচুর রান করলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার সুযোগ পেলেন। তবে ভারতের মহিলা দলের হেড কোচ হিসেবে তিনি বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেতেই পূর্ণ হলো একটি বৃত্ত।

এবারের বিশ্বকাপে ২১৫ রান ও ২২টি উইকেট নিয়ে টুর্নামেন্টের সেরা হলেন দীপ্তি শর্মা। তিনি বলেন, "যে বিভাগেই থাকি বা যে পরিস্থিতিতেই থাকি না কেন আমি খেলা উপভোগ করি। আমি পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলতে চেয়েছিলাম। খুব উপভোগ করেছি। অলরাউন্ডার হিসেবে পারফর্ম করার জন্য এর চেয়ে অসাধারণ অনুভূতি আর হতে পারে না।" ফাইনালে ৫৮ বলে ৫৮ রান করার পর বল হাতে পাঁচ উইকেট নেন দীপ্তি।
তিনি বলেন, "লরা উলভার্ট খুব ভালো ইনিংস খেলেছেন। কিন্তু আমরা সব সময় শান্ত ছিলাম এবং একে অপরকে উৎসাহিত করছিলাম। বোলার হিসেবে আমরা শেষ বল পর্যন্ত খেলার কথা বলছিলাম এবং নিজেদের সেরা বলে মনোযোগ দিচ্ছিলাম, সেটাই আমরা করেছি। ২০১৭ সাল থেকে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আমি আশা করি, এখন আমাদের জন্য আরও বেশি ম্যাচ থাকবে। আমি এই ট্রফিটি আমার মা-বাবাকে উৎসর্গ করতে চাই।"
ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় শেফালি ভার্মা বিশ্বকাপের দলে শুরুতে জায়গা পাননি। প্রতীকা রাওয়াল চোট পেয়ে ছিটকে যাওয়ায় সেমিফাইনালের আগে দলে আসেন। বছর একুশের শেফালি বলেন, "আমি শুরুতেই বলেছিলাম, ঈশ্বর আমাকে এখানে ভালো কিছু করার জন্য পাঠিয়েছেন এবং আজ তা প্রতিফলিত হয়েছে। আমরা জিতেছি বলে খুব খুশি, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এটা কঠিন ছিল, কিন্তু আমার নিজের ওপর বিশ্বাস ছিল-যদি আমি শান্ত থাকতে পারি, তাহলে সব কিছু অর্জন করতে পারব।"
শেফালি তাঁর সাফল্যের পিছনে পরিবারের অবদানের কথা তুলে ধরে বলেন, "আমার মা-বাবা, আমার বন্ধু, আমার ভাই, সবাই আমাকে সমর্থন করেছেন এবং কীভাবে খেলতে হয় তা বুঝতে সাহায্য করেছেন। এটা আমার দল এবং আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং আমি শুধু আমার দলকে জেতাতে চেয়েছিলাম। আমার মন পরিষ্কার ছিল এবং আমি আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করেছি।"
তিনি আরও বলেন, "স্মৃতিদি এবং হরমনদি, সবাই আমাকে সমর্থন করেছেন। তাঁরা (সিনিয়ররা) আমাকে শুধু নিজের খেলা খেলার জন্য বলেছিলেন এবং যখন সেই স্পষ্টতা পাওয়া যায়, তখন আর কিছুই লাগে না। এটা একটি স্মরণীয় মুহূর্ত।" সচিন তেন্ডুলকরের সঙ্গে দেখা হওয়া প্রসঙ্গে শেফালি জানান, "তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ায় খুব উৎসাহিত হয়েছি। আমি তার সঙ্গে কথা বলেছি এবং তিনি আমাকে আত্মবিশ্বাস দেন। তিনি ক্রিকেটের গুরু এবং তাঁকে দেখে আমরা সবসময় অনুপ্রাণিত হই।" উল্লেখ্য, হরমন ফাইনালে যখন শেফালিকে বল দিলেন এবং তিনি উইকেট পেলেন, তাঁর গোল্ডেন আর্ম যেন মনে করাল হিরো কাপের সচিনকে।
রিচা ঘোষ বলেন, "আমরা এই বিশ্বকাপ এবং এই ট্রফি তোলার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করছিলাম। আমরা চ্যাম্পিয়ন এবং আমি আমার অনুভূতি প্রকাশ করতে পারছি না। আবেগ, সবকিছু পুরোপুরি ভিন্ন।" তিনি আরও যোগ করেন, "আমরা জানতাম এটা আমাদের শেষ খেলা এবং আমরা সব কিছু দিতে চেয়েছিলাম। সব কিছু ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছিলাম। ফাইনালের চাপ ছিল কিন্তু আমি ভালো পারফর্ম করেছি এবং এটা একটা ভালো দিক। সবাই বিশ্বাস করেছিল যে আমি মারতে পারব এবং এটা আমার জন্য অনেক কিছু।"
প্রতীকা রাওয়াল বলেন, "অনুভূতি প্রকাশ করার মতো কোনও শব্দ নেই। আমার কাঁধে এই পতাকা। এর মানে অনেক কিছু এবং দলের সঙ্গে এখানে থাকাটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। চোট পাওয়া খেলারই অংশ। আমি এই দলের অংশ হতে পেরে খুব খুশি। আমি এই দলকে খুব ভালোবাসি।"
ভারতের সহ অধিনায়ক স্মৃতি মান্ধানা বলেন, "আমি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাব জানি না। এখনও হজম হচ্ছে না। ক্রিকেট মাঠে কখনও এতটা আবেগপ্রবণ হইনি। কিন্তু এটা একটা অবিশ্বাস্য মুহূর্ত। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ আর 'চ্যাম্পিয়ন্স ইন্ডিয়া' লেখা জার্সি পরা, এটা এক অসাধারণ মুহূর্ত। প্রতিটি বিশ্বকাপে আমরা যাই এবং আমাদের সবার জন্য অনেক হৃদয়ভঙ্গের ঘটনা ঘটেছে। আমরা সব সময় বিশ্বাস করি যে মেয়েদের ক্রিকেটের প্রতি আমাদের একটি বড় দায়িত্ব আছে।"
স্মৃতি বলেন, "আমরা যে সমর্থন পেয়েছি তা দেখে সত্যিই, আমি গত ৪০ দিনের কথা ব্যাখ্যা করতে পারছি না। যদি আমরা বিশ্বকাপ জিতি, তাহলে আমি প্রতি রাতে না ঘুমিয়ে সেই ৪৫ দিন নিতে রাজি। গত টি২০ বিশ্বকাপ আমাদের জন্য একটি কঠিন সময় ছিল। আমরা আমাদের ফিটনেস এবং প্রতিটি দিকের উপর কাজ করার জন্য একটি স্পষ্ট লক্ষ্য নিয়েছিলাম।"
তিনি দলের পরিবেশের প্রশংসা করে বলেন, "এই ধরনের বিশ্বকাপে যেভাবে সবাই একে অপরের পাশে ছিলেন এবং খেলেছেন তা অবিশ্বাস্য। দলের পরিবেশ কেমন ছিল তা আমি আপনাকে বলতে পারব না এবং এটা কেবল জাদু ছিল।"
হেড কোচ অমল মজুমদার বলেন, "গর্বিত। আমি জানি না, এটা এখনও হজম হয়নি। অবিশ্বাস্য অর্জন এবং কৃতিত্বের। সকলে অবিশ্বাস্যভাবে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। ক্রিকেটাররা প্রতিটি ভারতীয়কে গর্বিত করেছেন। আমরা সেই পরাজয়গুলোকে পরাজয় হিসেবে দেখিনি, আমরা সেগুলোকে এমনভাবে দেখেছি যে আমরা লক্ষ্য অতিক্রম করতে পারিনি।"
তিনি আরও যোগ করেন, "আমরা বেশিরভাগ ম্যাচেই আধিপত্য বিস্তার করেছি এবং আমরা ভেবেছিলাম কিছু ছোটখাটো বাধা আছে। আমরা তখনও টুর্নামেন্টে টিকে ছিলাম এবং এখন আমরা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। এটি ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত।"
শেফালি সম্পর্কে এক কথায় তিনি বলেন, "জাদুকরী। সেমিফাইনালে অসাধারণ পারফরম্যান্স। ফাইনালে, ঠাসা মাঠে, জাদুকরী ইনিংস খেলেছেন এবং তারপর বল হাতেও। ড্রেসিংরুমে আমরা এই বিষয়ে অনেক কথা বলেছিলাম।"
অমল আরও বলেন, "ফিল্ডিং এবং ফিটনেস এমন দুটি বিষয় ছিল যা নিয়ে আমরা কথা বলেছিলাম। বিশ্বকাপ ফাইনালের এই দিনে ক্রিকেটাররা নিজেদের যেভাবে মেলে ধরেছেন এর চেয়ে বেশি কিছু আমি চাইতে পারতাম না।"












Click it and Unblock the Notifications