চৈত্র সংক্রান্তিতে নীলপুজোর দিন তো ষষ্ঠী নয়! তাহলে নীলষষ্ঠীর ব্রত কেন? নেপথ্যে যে কাহিনি
চৈত্রমাসের সংক্রান্তিতে বাংলার হিন্দু সমাজের লৌকিক উৎসব হল নীল পুজো। এই নীল পুজোকে অনেকেই নীলষষ্ঠী বলে। শিবের নীলের সঙ্গে কী সম্পর্ক ষষ্ঠীর? নীলের দিন কেন ষষ্ঠীপুজো হয়, গ্রাম বাংলায় মায়েরা তাঁদের সন্তানদের আয়ুস্কামনায় ষষ্ঠীর ব্রত করেন? এর নেপথ্যে রয়েছে এক কাহিনি।
চিত্র সংক্রান্তিতে অর্থাৎ নববর্ষের পয়লা বৈশাখের ঠিক আগের দিন পালন করা হয় ষষ্ঠীর ব্রত। এই দিনেই অনুষ্ঠিত হয় গাজন। এই নীল ও গাজনকে কেন্দ্র করে উৎসবের চেহারা নেয় গ্রামবাংলা। এদিনই আবার মায়েরা সন্তানের মঙ্গল কামনায় নীলের উপোস করেন।

এই নীলপুজোকে কেন্দ্র করে যেমন শিব-দুর্গার বিবাহের এক কাহিনি রয়েছে, তেমনই এই দিনে নীলষষ্ঠীব্রতেরও মাহাত্ম্য রয়েছে। এই দিনে ষষ্ঠীপুজো করলে সন্তানের দীর্ঘায়ু লাভ হয়। এর পিছনেও রয়েছে এক কাহিনি। এই প্রতিবেদনে সংক্ষেপে এই দুই কাহিনি তুলে ধরব।
নীল অর্থাৎ নীলকণ্ঠ। নীলকণ্ঠ হল মহাদেব শিবের অপর এক নাম। এই নীল বা নীলকণ্ঠের সঙ্গে নীলচণ্ডিকা বা নীলাবতী পরমেশ্বরীর বিয়ে উপলক্ষে লৌকিক আচার-অনুষ্ঠান হয়েছিল। কাহিনি অনুসারে, দক্ষযজ্ঞের আসরে দেহত্যাগের পর পুনরায় শিব-জায়া সতী আবির্ভূতা হয়েছিলেন।
শিবের সতী পরমা সুন্দরী কন্যারূপে নীলধ্বজ রাজার বিল্ববনে আবির্ভূতা হন। রাজা তাঁকে নিজ কন্যারূপে লালন-পালন করেন। তারপর তিনি শিবের সঙ্গে বিয়ে দেন নিজ কন্যার। বাসর ঘরে নীলাবতী শিবকে মোহিত করেন। তারপর মক্ষিপারূপ ধরে ফুলের সঙ্গে জলে নিক্ষিপ্ত হয়ে মত্যুবরণ করেন।

এরপর রাজা ও রানি কন্যার সোকে প্রাণ বিসর্জন দেন। এই নীলপুজো হল নীলকণ্ঠ ও নীলাবতীর বিবাহ অনুষ্ঠানের স্মারক। চিত্রমাসের সংক্রান্তির দিন সারা দিন উপোস করার পর শিবের মাথায় জল ঢেলে শিবকে প্রণাম করেন মহিলারা। সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালিয়ে শিবের মাথায় জল ঢালার পর ব্রতভঙ্গ হয়।
এই নীলের ব্রত হয় সন্তানের মঙ্গল কামনায়। এই ব্রত করলে কোনোদিন সন্তানের অমঙ্গল হয় না। সন্তান দীর্ঘজীবন লাভ করে। শিবের পাশাপাশি পুজো হয় ষষ্ঠীরও। যেহেতু সন্তানের মঙ্গল কামনাই উদ্দেশ্য ষষ্ঠীদেবীও পুজো পান এদিনষ তাই অনেকে নীলষষ্ঠীর ব্রতও বলেন। নীল মানে নীলকণ্ঠ আর ষষ্ঠী উভয়ের পুজোই হয় এদিন।
এই নীলষষ্ঠী পুজো কিন্তু হঠাৎ করেই শুরু হয়নি। এর নেপথ্যে রয়েছে এক গল্প। পুরাকাল থেকেই তা ঘরে ঘরে প্রচারিত হয়ে আসছে। এক বামুন আর এক বামনি ভক্তিভরে পুজো ও ব্রত পালন করার পরও তাঁদের সন্তান বেশিদিন বাঁচত না। একদিন তারা কাশীতে গিয়ে গঙ্গাস্নান করার পর মনের দুঃখে কাঁদছিলেন।

তাঁদের কান্না দেখে মা ষষ্ঠীবুড়ি বামনির বেশ ধরে তাঁদের কাছে এসে জিজ্ঞাসা করেন, তোরা কাঁদছিস কেন? তখন দম্পতি তাঁদের দুঃখের কথা বর্ণনা করেন। তখন ষষ্ঠী বলেন, তোরা কি নিলষষ্ঠী করেছিস? তখন তাঁরা বলেন, এই ব্রতের কথা আমরা জানি না মা।
তখন মা ষষ্ঠী বলেন, চৈত্র মাসভর সন্ন্যাস করার পর সংক্রান্তিতে সারাজদিন উপোস থেকে শিব পুজো করতে হবে। সন্ধ্যা নাগাদ নীলকণ্ঠ আর নীলাবতীর পুজো করে শিবের ঘরে বাতি জ্বেলে মা ষষ্ঠী পুজো করে প্রণাম করে তবেই ব্রত ভাঙতে হবে। যাঁরা এই নীলষষ্ঠী করবে, তাদের ছেলে-মেয়ে কখনও অল্প বয়সে মরবে না।
এই কথা বলার পরই মা ষষ্ঠী অদৃশ্য হয়ে যান। তারপর তাঁরা ঘরে ফিরে গিয়ে ভালো করে নীলষষ্ঠীর ব্রত শুরু করেন। এরপর তাঁদরে ছেলেমেয়ে হলে তাঁরা সবাই দীর্ঘায়ু লাভ করেন। সেই থেকেই এই দিনটিতে সন্তানদের মঙ্গল কামনায় নীলষষ্ঠী ব্রত করে আসছেন মায়েরা।












Click it and Unblock the Notifications