কর্ণ-অর্জুনের শত্রুতা কত জন্মের, তাঁদের প্রতিহিংসার নেপথ্যে রয়েছে চমকপ্রদ এক কাহিনি
কর্ণ-অর্জুনের শত্রুতা কত জন্মের, তাঁদের প্রতিহিংসার নেপথ্যে রয়েছে চমকপ্রদ এক কাহিনি
দ্বাপরে কর্ণ ও অর্জুন ছিলেন পরস্পর সহোদর। কিন্তু তাঁরা আমৃত্যু শত্রু হিসেবেই বর্ণিত হয়েছিলেন মহাভারতে। তাঁদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ, তা নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। কিন্তু তাঁদের এই শত্রুতা কি শুধু মহাভারতেই বা দ্বাপর যুগেই সীমাবদ্ধ ছিল? তা কিন্তু নয়। কর্ণ ও অর্জুনের শত্রুতা জন্ম জন্ম হয়ে চলেছে, অন্তত পদ্মপুরাণে এমনই উপাখ্যান পাওয়া যায়।

স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে কর্ণ ও অর্জুনের শত্রুতা কত জন্মের। পদ্মপুরাণ অনুযায়ী, কাহিনির শুরু এক জন্ম আগে। কর্ণ ও অর্জুন মহাভারতের দুই শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর। দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী যোদ্ধা। দুই শ্রেষ্ঠ বীরের শত্রুতার কাহিনি খুঁজতে গেলে যেতে হবে মহাভারত ছাড়িয়ে পুরাণে। যেখাণে বর্ণিত রয়েছে দুজনের শত্রুতার বীজ।
কর্ণ ও অর্জুন মহাভারতে দুই দেবপুত্র হলেও, তাঁদের শত্রুতা শুরু হয়েছে রাক্ষস-কুল থেকে। পদ্মপুরাণে বর্ণিত আছে, একদিন ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর মধ্যে আলোচনা চলছিল, ব্রহ্মাণ্ডের ভারসাম্য বজায় রাখতে কার ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এক পর্যায়ে এসে সেই আলোচনা পর্যবসিত হয় তর্কে।
ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর মধ্যে এই বাকবিতণ্ডা চলাকালীন মধ্যস্থতা করতে আসেন মহাদেব। মহেশ্বর তর্কের কারণ জানতে চান। তখন ব্রহ্মা বলেন, আমি যা বলছি, তা-ই সত্য। আমি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে সকলকে সৃষ্টি করেছি। তাই আমার কাজই সবথেকে মহান। আমি না থাকলে কেউ থাকত না। এমনকী বিষ্ণুও থাকতেন না, মহাদেবও থাকতেন না।
ব্রহ্মার কথা শুনে শিব প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। শুরু হয় ব্রহ্মা ও শিবের মধ্যে বাদানুবাদ। তাঁদের বাদানুবাদ এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে ব্র্হ্মা নিজের মাথার ঘাম নীচে ফেলে বলেন, এই ক্রোধের ঘাম থেকে সৃষ্টি হোক এক অসুরের। ব্রহ্মার সৃষ্ট অসুরের নাম হয় শ্বেতজ। তাঁর শরীরে এক হাজার কবচ। এ জন্য তাঁকে সহস্র কবচও বলা হয়। ব্রহ্মা শ্বেতজকে নির্দেশ দেন, তুমি এখনই মহাদেবকে হত্যা করে আমার অপমানের প্রতিশোধ নাও।
ব্রহ্মার রুদ্রমূর্তি দেখে শিব পরামর্শ করতে শুরু করেন, কী করা উচিত। শ্রীবিষ্ণু তখন মহাদেবকে বলেন, আপনি আমার ডান হাতে আঘাত করে রক্তাক্ত করুন, সেই রক্তে আপনার তেজ মিশিয়ে দিন। তার ফলে যে অসুর সৃষ্টি হবে, সেই একমাত্র শ্বেতজকে পরাজিত করতে পারবে। মহাদেব শ্রীবিষ্ণুর কথামতোই কাজ করেন। বিষ্ণুর হাত থেকে রক্তপ্রবাহ শুরু হলে শিব তাঁর দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। সৃষ্টি হয় সহস্র বাহুযুক্ত বিশালাকার অসুর। তাঁর নাম দেওয়া হয় রক্তজ। এরপর মহাদেব রক্তজকে আদেশ দেন শ্বেতজের সঙ্গে যুদ্ধ করে তাঁকে পরাজিত করতে।
শুরু হয় ভয়ঙ্কর যুদ্ধ। শ্বেতজ ও রক্তজ একে অপরকে পরাজিত করার বহু চেষ্টা করে। কিন্তু বহুকাল ধরে চলতে থাকা যুদ্ধে কেউ কাউকে পরাজিত করতে সক্ষম হননি। এই যুদ্ধে শ্বেতজ রক্তজের ৯৯৮টি হাত কেটে দেন আর রক্তজ শ্বেতজের ৯৯৯টি কবচ ভেঙে দেন। তারপরও যুদ্ধ চলে অবিরাম। তখন ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর বুঝতে পারেন এভাবে যুদ্ধ চলতে থাকলে মহাজাগতিক প্রলয় ঘটে যাবে। তাই যুদ্ধ থামিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ঠিক হয় এই যুদ্ধ আবার পরের জন্মে শুরু হবে। তখনই এই যুদধের পরিণাম ঠিক হবে। কে জিতবে আর কে হারবে, তা স্থির করতে অপেক্ষা করতে হবে আরও একটা জন্ম। এরপর শ্বেতজের পুনর্জন্মের দায়িত্ব দেওয়া হয় সূর্যদেবকে, আর রক্তজের পুনর্জন্মের দায়িত্ব দেওয়া হয় ইন্দ্রদেবকে। ইন্দ্র রক্তেজর জন্মের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, রাম অবতারে আপনি আমরা মানস পুত্র বালীকে হত্যা করেছিলেন। রক্তজ এ জন্মে মারা গেলে আমি তার জন্ম দায়িত্ব নেব না। ইন্দ্রদেবকে এরপর আশ্বস্ত করেন বিষ্ণু। বলেন, আপনার পুত্র হিসেবে রক্তজ জন্মগ্রহণ করলে সে-ই জয়ী হবে যুদ্ধে।
এভাবে পরের জন্মে শ্বেতজ কর্ণ রূপে আর রক্তজ অর্জুন রূপে জন্মগ্রহণ করেন। কুন্তী-পুত্র হয়ে সূর্যদেবের বরে জন্ম হয় কর্ণের আর ইন্দ্রদেবের পরে জন্ম হয় অর্জুনের। মহাভারতে যতবার কর্ণ-অর্জুনের যুদ্ধ হয়েছে কর্ণই পরাজিত হয়েছেন। আর কুরুক্ষেত্র্রে যুদ্ধে কর্ণকে হত্যা করেছেন অর্জুন। শেষ হয় দুই জন্মের শত্রুতার। অর্জুনরূপী রক্তজ বধ করে কর্ণরূপী শ্বেতজকে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল বিষ্ণু তথা নারায়ণের বিশেষ ভূমিকা।
এই ঘটনা আবার হরিবংশ পুরাণে অন্যরূপে বর্ণিত হয়েছে। সেই উপাখ্যান নিয়ে প্রতিবেদন আমরা পরবর্তী সময়ে পেশ করব।












Click it and Unblock the Notifications