সুচিত্রা-সন্ধ্যা ছিলেন একে অপরের পরিপূরক, গানের ইন্দ্রধনুতে তাঁদের এই পথ শেষ হবে না
সুচিত্রা-সন্ধ্যা ছিলেন একে অপরের পরিপূরক, গানের ইন্দ্রধনুতে তাঁদের এই পথ শেষ হবে না
'গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু' দিয়ে শুরু হয়েছিল পথ চলা। 'এই পথ যদি না শেষ' হত, তাহলে তার থেকে ভালো আর কিই-বা হ'ত। কিন্তু সেই পথ চলা শেষ হয়েছে। সন্ধ্যার মেঘমালা হয়েই চিরদিন বাংলার হৃদয়ে চিরকালের সম্রাজ্ঞী হয়ে থাকবেন গীতশ্রী। যেমন বাঙালির হৃদয়ে চিরকালের বাসা বেঁধে নিয়েছেন সুচিত্রা। তাঁদের জুটি চিরঅক্ষয়, চির-অবিনশ্বর হয়ে থাকবে বাংলা ও বাঙালির মণিকোঠায়।

সুচিত্রার লিপে সন্ধ্যা কণ্ঠের মিল
বাংলা সিনেমা ও সঙ্গীত জগতে তাঁরা ছিলেন একে-অপরের পরিপূরক। তাঁদের সৃষ্টির মাঝে তাঁরা অমর হয়ে থাকবেন। আসলে সন্ধ্যা ও সুচিত্রা ছিলেন একে অপরের পরিপূরক। একে অপরকে সম্পূর্ণ করেছেন তাঁরা। ‘গানে মোর কোন ইন্দধনু' দিয়ে সন্ধ্যা-সুচিত্রা পথ চলা শুরু করেছিল সেই ১৯৫৪ সালে। অগ্নিপরীক্ষায় সুচিত্রার লিপে সন্ধ্যার গান এক কথায় সুপারহিট। সুচিত্রার রূপে সন্ধ্যা কণ্ঠের যে মিল পেয়েছিল বাঙালি দর্শক ও শ্রোতা, তা মায়াজাল বিছিয়ে দিয়েছিল বাংলা চলচ্চিত্র ও সঙ্গীত জগতে।

একাকার হয়ে গিয়েছিল দুই কণ্ঠ
তারপর উত্তম-সুচিত্রার ছবি মানেই হেমন্ত-সন্ধ্যার গান। সর্বকালের সেরা প্রেম যেমন পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন সুচিত্রা-উত্তম, তেমনই তাঁদের প্রেমকে সূর্যরাগে রাঙিয়ে দিয়েছিলেন সন্ধ্যা-হেমন্ত জুটি। সুচিত্রার লিপে এরপর একের পর এক গান গেয়েছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। এই পথ যদি না শেষ হয় গানে আন্দোলিত হয়েছিল বাঙালি সঙ্গীতপ্রেমীরা। দর্শককুল বুঝতেই পারেনি ‘তুমি বলো' বা ‘লাল লালা লা' সন্ধ্যার না সুচিত্রার গলা। ঠিক তেমনই ‘হারানো সুরে' সেই বিখ্যাত ‘রমা' ডাকও দর্শকরা বুঝতে পারেননি, ওটা উত্তম না হেমন্তের। একাকার হয়ে গিয়েছিল দুই কণ্ঠ।

সন্ধ্যার গলা ছাড়া ভাবাই যেত না সুচিত্রাকে
‘এই পথ যদি না শেষ হয়' গানে ‘তুমি বলো' বা ‘লাল লালা লা' আসলে বলেছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। দর্শক সপ্তপদী ছবি দেখে মনে করেছিল, তা সুচিত্রা সেনেরই কণ্ঠ। তারপর থেকে সুচিত্রা মানে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা মানে সুচিত্রা। একে অপরে মিশে গিয়েছিলেন গানের ইন্দ্রধনুতে। সুচিত্রা সেনের লিপ মানেই সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ মিথ হয়ে গিয়েছিল বাংলায়। সন্ধ্যার গলা ছাড়া ভাবাই যেত না সুচিত্রা সেনকে।

সুচিত্রার লিপে যে কত গান আছে সন্ধ্যার
সুচিত্রার লিপে যে কত গান আছে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের তা গুনে শেষ করা যাবে না। গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু, কে তুমি আমারে ডাকো, জানি না ফুরাবে কবে এই পথ চাওয়া, ঘুম ঘুম চাঁদ, কিছুক্ষণ আরও না হয় রহিতে কাছে, এ মধুরাত শুধু ফুল পাপিয়ার, তব বিজয়মুকুট আজকে দেখি, এই তো আমার প্রথম ফাগুন বেলা, আমার জীবনে নেই আলো, খেলা নয় এ তো খেলা নয়, আমি স্বপ্নে তোমায় দেখেছি, দু'চোখের বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে, ক্লান্তির পথ বুঝি বা ফুরলো মোর, নূপুরের গুঞ্জনে বনবীথি উথলায়, এ শুধু গানের দিন এ লগন গান শোনাবার- চিরদিন দাগ কেটে যাবে সঙ্গীতপ্রেমীজদের মনে।

যতদিন গান থাকবে, ততদিন সন্ধ্যা-সুচিত্রা
শুধু কি কন্ঠের মিল, সন্ধ্যার গায়কীর সঙ্গে অদ্ভুত মিল ছিল সুচিত্রা সেনের লিপ দেওয়ার। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় তা নিজেই বলেছিলেন। বলেছিলেন, আমি নিজেও অবাক হয়েছিল সুচিত্রা যেভাবে আমার গানে লিপ দিত। শুধু মাত্র চোখ আর মুখের ভঙ্গিতে এমন করে গলা মেলাতে কাউকে দেখিয়ে। দুই আত্মা যেন এক হয়ে গানের সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করত। সন্ধ্যার সেই সব গান অমর হয়ে আছে সুচিত্রা লিপে। যতদিন গান থাকবে, ততদিন সন্ধ্যা-সুচিত্রা রয়ে যাবে সঙ্গীতপ্রেমীর হৃদয়ে।

সেরা জুটিই ছিলেন না, বন্ধুত্বও ছিল অপার
সুচিত্রা-সন্ধ্যা শুধু বাংলা সিনেমার সেরা জুটিই ছিলেন না, তাঁদের বন্ধুত্বও ছিল অপার। বিশিষ্টদের সাক্ষাৎকারে জানা যায়, সুচিত্রা যখন সাত পারে বাঁধা ছবি করে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছিলেন, সেই পুরস্কার নিতে যাওয়ার আগে সন্ধ্যা তাঁকে সাজিয়ে দিয়েছিলেন। আবার এমন কথাও শোনা যায় সিনেমা ছাড়ার র সুচিত্রা যখন বেলুড়মঠে যেতেন তখন নিয়ে যেতেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কেই। গানে মোর কোন ইন্দ্র ধনু দিয়ে যে পথ চলা শুরু হয়েছিল, সেই পথ চলা শেষ হবে না কোনওদিনই। চিরদিন মানুষের হৃদয়ে বাজবে এই পথ যদি না শেষ হয়...।












Click it and Unblock the Notifications