• search
For Quick Alerts
ALLOW NOTIFICATIONS  
For Daily Alerts

(প্রথমার্ধ) জীবন ও মৃত্যুর সঙ্গম : অর্ধনারীশ্বর অথবা তৃতীয় প্রকৃতি

  • By Shuvro Bhattacharya
  • |

শিবের এই অর্ধনারীশ্বর রূপ বা মূর্তিটির উদ্ভব ঠিক কখন হয়েছে, বলা কঠিন। বৈদিক ঋষিগণ মূর্তিপূজক ছিলেন না, কিন্তু প্রাক্-বৈদিক যুগে অথবা বৈদিক যুগের সমকালীন সিন্ধু সভ্যতার যুগে মূর্তিপূজার বহুল প্রচলন ছিল। তবে সিন্ধু সভ্যতার যুগের যেসব দেবমূর্তির নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে সেগুলি শিবমূর্তি বা শক্তিমূর্তি বলে স্থিরীকৃত হলেও উভয়ের সংমিশ্র যুগলমূর্তি অথবা 'অর্ধনারীশ' বা 'অর্ধনারীশ্বর' মূর্তির নিদর্শন মেলেনি। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনাদি থেকে দেখা যায় যে, গুপ্তযুগে (তৃতীয়-পঞ্চম শতাব্দী) এবং কুষাণ যুগে (প্রথম-তৃতীয় শতাব্দী) মূর্তিপূজা হিন্দুদের মধ্যে জনপ্রিয় হতে শুরু করেছিল।

গুপ্ত ও কুষাণ যুগের যেসব মূর্তি পাওয়া গিয়েছে সেগুলির মধ্যে শিবের অর্ধনারীশ্বর মূর্তি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। মূর্তির ডানদিকে সায়ুধ অর্ধমহাদেব, বামদিকে অর্ধপার্বতী। গুপ্ত ও কুষাণ যুগের এই অর্ধনারীশ্বর মূর্তিগুলিই এ পর্যন্ত প্রাপ্ত অর্ধনারীশ্বর মূর্তির প্রাচীনতম নিদর্শন। দক্ষিণ ভারতের তাঞ্জোর এবং দরশুরামের প্রাচীন মন্দিরগাত্রে উৎকীর্ণ অর্ধনারীশ্বর মূর্তিগুলি চোল যুগের (নবম-দশম শতাব্দীর) বলে পণ্ডিতরা মনে করেন।

জীবন ও মৃত্যুর সঙ্গম : অর্ধনারীশ্বর অথবা তৃতীয় প্রকৃতি

পুরাণে এমন অনেক কাহিনী রয়েছে, যা যুগ যুগ ধরে আমাদের মনে একই সঙ্গে বিষ্ময় এবং কৌতুহল জাগিয়ে তোলে। ঠিক তেমনই একটি প্রসঙ্গ-- অর্ধনারীশ্বর। আধুনিককালে এই শব্দবন্ধটি প্রসারিত হয়ে কখনও কখনও ব্যবহার করা হয় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের পরিচয় দিতেও। কিন্তু কখনও কী মনে হয়েছে ঠিক কোথায়, কবে, কীভাবে এই অর্ধনারীশ্বরের জন্ম হয়? সত্যিই এমন কিছু কি আছে, নাকি এ কেবলই লোকগাথা? বিভিন্ন পুরাণ এবং লোকগাথায় অর্ধনারীশ্বর নিয়ে রয়েছে মতভেদ। তবুও তারই মধ্যে লিঙ্গ পুরাণ মতে:

সৃষ্টির শুরুতেই প্রস্ফূটিত হয় একটি পদ্ম। তার উপর ধ্যানমগ্ন হয়ে উপবিষ্ঠ ছিলেন প্রজাপিতা ব্রহ্মা। ধ্যান ভাঙলে তাঁর খেয়াল হয় যে তিনি সম্পূর্ণ একা। একাকীত্বকে ভয় পেয়ে তিনি ভাবতে শুরু করেন কী করলে তাঁর নিঃসঙ্গতার অবসান হবে। আচমকাই তাঁর চোখের সামনে ভেসে মহেশ্বরের আকার, যাঁর এক অংশ পুরুষের এবং বাকি অর্ধেক অংশ নারীর। এই দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ব্রহ্মা নিজেকে দু'ভাগে বিভক্ত করে ফেললেন-ডান দিকের অংশ থেকে জন্ম নিল পুরুষ লিঙ্গের সব প্রাণী এবং বাঁ দিক থেকে জন্ম নিল সব প্রাণীর নারী লিঙ্গ।

আবার নাথ লোকগাথায় অর্ধনারীশ্বরের ব্যাখ্যা সামান্য ভিন্ন। সেই মত অনুযায়ী সাধুরা যখন শিবের সাক্ষাত্‍‌ প্রার্থনায় কৈলাসে গেলেন, তখন দেখলেন তিনি অর্ধাঙ্গিনীর সঙ্গে সঙ্গমরত। তাঁরা যে সেখানে উপস্থিত সেই জ্ঞানও নেই তাঁর। মহেশ্বরকে এমন অবস্থায় দেখে প্রথমে বিষ্মিত হলেও পরে তাঁরা বোঝেন যে তাঁকে এই অবস্থা থেকে বিরত করা মানে শরীরের ডান দিক থেকে বাঁ-দিককে আলাদা করে দেওয়া। সেই থেকে তাঁরা শিব-কে অর্ধনারীশ্বর হিসেবেই পুজো করতে থাকলেন।

তামিল মন্দির গাথায় বর্ণিত হয়েছে অর্ধনারীশ্বরের অন্য ব্যাখ্যা। শিবের বাহন ভৃঙ্গীর ইচ্ছে হয়েছিল শিবকে প্রদক্ষীণ করার। কিন্তু তাতে বাধ সাধলেন পার্বতী। তিনি তাঁর স্বামীর কোলে বসে থাকায় শিবকে প্রদক্ষীণ করতে পারলেন না ভৃঙ্গী। । ভৃঙ্গী মাছির রূপ নিয়ে শিবকে প্রদক্ষীণ করার চেষ্টা করলেন। তখন পার্বতী তাঁর এবং শিবের মধ্যে সব ব্যবধান মিটিয়ে মিলে গেলেন মহেশ্বরের শরীরের সঙ্গে। কিন্তু তাতেও বিরত করা গেল না ভৃঙ্গীকে। তিনি আবার পোকার রূপ ধরে দু'জনের মধ্যে প্রবেশ করার চেষ্টা করলেন। ভৃঙ্গীর এই ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে দেবী পার্বতী তাঁকে অভিশাপ দেন। তাঁর অভিশাপে শরীরের প্রত্যেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, শিরা-উপশিরা হারিয়ে কঙ্কালসার হয়ে যান ভৃঙ্গী। অবশেষে তাঁর প্রতি দয়া পরবশ হয়ে শিব ভৃঙ্গীকে একটি তৃতীয় পা দেন যাতে অন্তত সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন তিনি। এই শাস্তি একটা কারণেই দেওয়া হয়েছিল, যাতে যুগযুগান্ত ধরে মানব সভ্যতাকে মনে করানো যায়, নারী শক্তিকে অবহেলা বা তাচ্ছিল্যের পরিণাম ভয়ংকর হতে পারে।

উত্তর ভারতের প্রচলিত লোকগাথা অনুযায়ী, শিবের জটায় গঙ্গাকে অবস্থান করতে দেখে ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে ওঠেন পার্বতী। তাঁকে শান্ত করার জন্যে পার্বতীর শরীরের সঙ্গে মিলিত হন মহেশ্বর। একাংশে বর্তমান থাকে শিবের উপস্থিতি, অন্য অংশে বিরাজ করেন নারী শক্তি পার্বতী।

অর্ধনারীশ্বর বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নানা প্রতিকৃতি, নানা গাথা-উপগাথা। পারস্পরিক যৌন নির্ভরতা, সঙ্গতি, পূর্ণতা এবং পরিতৃপ্তি--- এই সবই জড়িয়ে আছে এই একটি নামের সঙ্গে। কিন্তু কখনও কি মনে এসেছে একটি প্রশ্ন? কেন এই দুই অংশ বিনিমেয় নয়? কেন পুরুষের অবস্থান সর্বদা ডান দিকেই হয়, এবং বাঁদিকের অধিকার থাকে কেবলই নারী শক্তির কাছে? কেন কখনও এঁরা স্থান পরিবর্তন করেন না? এছাড়াও আরও একটি প্রশ্ন কি কখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়নি-এই অর্ধনারীশ্বর সত্তায় শিবের অস্তিত্ব ঠিক কতখানি? কেন কখনও অর্ধনর-ঈশ্বরী পরিচয় স্বীকৃতি পায়নি? কোনও একটি নির্দিষ্ট কারণ নয়, এর পিছনে রয়েছে বেশ অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি রয়েছে যা কোনওভাবেই নজরআন্দাজ করা যায় না।

ডানদিক না বাঁদিক?

হিন্দু শাস্ত্রে এবং জীবনধারায় দিক-এর মাহাত্ম অনেক। রুদ্রমূর্তি তাণ্ডবনৃত্যরত শিব নটরাজ বেশে তাঁর বাঁ পা তুলে দাঁড়ান। আবার সৃষ্টির রক্ষাকর্তা রূপে শ্রীকৃষ্ণ কিন্তু তাঁর ডান পা ভাঁজ করে বাঁশির সুরে মগ্ন হন। ব্রাহ্মণদের পবিত্র পৈতে ঝোলানো থাকে বাঁ-কাঁধে ঈশ্বরকে নৈবেদ্য দানের সময়ে। কিন্তু সেই পৈতে দিক পালটে ঝোলানো হয় ডান কাঁধ দিয়ে যখন পিতৃপুরুষকে জলদান করা হয়ে থাকে। হিন্দু শাস্ত্রে স্ত্রী সব সময়ে স্বামীর বাঁ-দিকে অধিষ্ঠান করেন। এই সব মেনেই অর্ধনারীশ্বরের নারী শক্তির স্থান বাঁদিকে। শুধু মহেশ্বরই নন, বিষ্ণুও যখন অর্ধনারীশ্বর অবতারে আবির্ভূত হন, তখন তাঁর বাঁদিকেই জায়গা হয় দেবী লক্ষী বা শ্রীরাধিকার। এই কারণে দেবী লক্ষী বা শ্রীরাধিকা প্রায়শই 'ভামাঙ্গী' (যিনি বাঁদিকে থাকেন) নামে পরিচিত হন।

কখনও এমন যুক্তিও দেওয়া হয়ে থাকে যে আমাদের শরীরে হৃদযন্ত্রের অবস্থান বাঁদিকে। তাই বাঁদিক তাঁর জন্যেই যিনি হৃদয়ের খুব কাছে। বাঁদিকে প্রিয়তমের অবস্থান হলে, ডান হাতে তাঁর রক্ষার দায়িত্ব পালনে কোনও বাধা থাকে না।

শাস্ত্র কিংবা পৌরাণিক ব্যাখ্যার বাইরেও রয়েছে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ। শরীরের বাঁদিকের সঙ্গে যেমন হৃদয়ের যোগ আছে বলে মনে করা হয়, তেমনই ডান দিকের সঙ্গে মস্তিষ্কের যোগ আছে বলেই মানা হয়ে থাকে। মস্তিষ্কের ডান ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে শরীরের বাঁদিকের অংশ। তাই মস্তিষ্কের ডান ভাগের সঙ্গে নারীসুলভ আচরণ, সৃজনশীলতা ও ভাবমূলক চিন্তাভাবনাকেই সংযুক্ত করা হয়। অন্যদিকে মস্তিষ্কের বাঁদিকের অংশ নিয়ন্ত্রণ করে শরীরের ডান দিককে যার সঙ্গে জড়িত থাকে পুরুষতুল্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।

শরীরের বাঁদিক নির্ভরশীল ব্যক্তির জন্যে। শিব এবং বিষ্ণু যখন মিলিত হয়ে হরি-হর বা হর-হরি রূপ নেন, তখন এই ধারণা মেনেই বৈষ্ণবরা মনে করেন বিষ্ণুর উপরে মহাদেব নির্ভরশীল। আবার এই ধারণার বশবর্তী হয়ে শৈবরা বিশ্বাস করেন মহাদেবের থেকে পরাক্রমশালী আর কেউই হতে পারেন না। তাই হর-হরি যুগলে শিবের অবস্থান হবে ডান দিকেই।

হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী, ভামা-মার্গের (বাঁ-দিকের সবকিছু) সঙ্গে ভিন্নমার্গী এবং অপ্রাকৃতিক বস্তুকে তুলনা করা হয়। তান্ত্রিক কার্যকলাপের সঙ্গে এই মার্গের সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়। অন্যদিকে বৈদিক পদ্ধতির সঙ্গে যোগ রয়েছে ডান-দিকের। তান্ত্রিক এবং বৈদিক দুই মতেই নারীর উপস্থিতির উল্লেখ আছে। তবে তান্ত্রিক আচারে নারীকে শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং বৈদিক আচারে নারীকে মায়া হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

পুরুষ না নারী

হিন্দু শাস্ত্র এবং দর্শনে লিঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বহু যুগ ধরে নারীকে বস্তুবাদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। অন্যদিকে পুরুষের সঙ্গে তুলনা হয়েছে আধ্যাত্মিকতার। যা কিছু পার্থিব তার তুলনা হয় নারীরূপের সঙ্গে এবং যা অপার্থিব সব কিছুরই প্রতীক পুরুষলিঙ্গ। এই প্রচলিত ধারণা থেকেই অনেকেই মনে করেন, অর্ধনারীশ্বর আসলে এই সমাজেরই প্রতিবিম্ব, যেখানে পুরুষের ভূমিকাই সব থেকে বেশি। এই ধারণা ঐতিহাসিক সময় থেকে চলে আসা লিঙ্গ বৈষম্যকেই তুলে ধরে। অর্ধনারীশ্বর সম্পর্কে নির্দিষ্ট ধারণায় উপনীত হতে বিশেষ সাহায্য করে না বলাই ভালো। তাই অর্ধনারীশ্বর সম্পর্কে প্রচ্ছন্ন ধারণা পেতে হলে আগে সরে আসতে হবে লিঙ্গ বৈষম্যের থেকে।

সম্পূর্ণ ভিন্ন মতবাদ

হিন্দু অধিবিদ্যা অনুযায়ী কোনও নৈর্ব্যক্তিক দুনিয়ার অস্তিত্ব নেই। যে বস্তু অনুভব করা যায়, একমাত্র সেই বস্তুরই অস্তিত্ব আছে। যে দৃশ্য দৃশ্যমান নয়, সেই দৃশ্যের বাস্তবে কোনও অস্তিত্বই নেই। জীবন বিষয়ীকেন্দ্রিক। আর এটাই সত্যি। এই দৃষ্টিভঙ্গীকে কেন্দ্র করে বিশ্লেষণ করতে চাইলে বলা ভালো ব্যক্তি অভিজ্ঞতার জন্ম দেন তা উপলব্ধি করে। কিন্তু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু এবং ব্যক্তির অস্তিত্ব পরস্পরের উপরেই নির্ভরশীল। ঠিক একইভাবে অর্ধনারীশ্বরের অস্তিত্ব নারী এবং পুরুষ দু'জনের উপরেই নির্ভরশীল। সেক্ষেত্রে ডান এবং বাঁ উভয়ই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একে অপরকে ছাড়া তারা অসম্পূর্ণ।

পুরুষ সংবেদশীলতার সঙ্গে অভিজ্ঞতার সাক্ষী হন... আর নারী স্বয়ং অভিজ্ঞতা। যেহেতু হিন্দুশাস্ত্রে এবং তার আচার ব্যবহারের সঙ্গে সর্বদাই দেব-দেবীর অস্তিত্ব জড়িয়ে থাকে, তাই আরও সহজ করে বলতে গেলে, দেবী বা নারী শক্তি দেব বা পুরুষ জীবনে অনুপ্রেরণার ভূমিকা পালন করেন। সরস্বতী, লক্ষ্মী বা শক্তির সঙ্গে নৈর্ব্যক্তিকতা, জ্ঞান, বিদ্যা এবং শক্তিকে একাত্ম করে দেখা হয়। সৃষ্টি, স্থিতি এবং বিনাশের ক্ষমতা রাখেন এই নারী শক্তি। অন্যদিকে ত্রিদেব, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরের সঙ্গে তুলনা করা হয় কামনা, নিয়ন্ত্রণের মতো গুণের। পুরুষ দেবতা মানুষের ভিতরের ঐশ্বরিক শক্তির প্রতীক এবং আমাদের ঘিরে থাকা বৃহত্তর ঐশ্বরিক শক্তির প্রতীক দেবী শক্তি।

যদি আরও সহজ ভাষায় বলতে হয়, তাহলে বলা ভালো শিবের অস্তিত্ব বা পৃথিবীর অপর নাম শক্তি। শক্তি আছেন বলেই শিব আছেন। শক্তি তাঁরই ভাবনা এবং চিন্তার নারী রূপ। শক্তি আছেন বলেই জ্ঞান, সম্পত্তি এবং পরাক্রম আছে। শক্তি সর্বদাই রূপান্তরিত হতে থাকেন, তিনি মায়া এবং তাঁকে সর্বদা মান দিয়ে আসেন মহেশ্বর। তাঁরা এক এবং অভিন্ন।

গ্রীক পুরাণে কথিত আছে, কেরিয়াতে কোনো এক ছোট নদীতে বাস করত অতি সুন্দরী এক জলপরী। নাম সালমেসিস। সে প্রেমে পড়ে যায় হারমিস ও আফ্রোদিতির পুত্র, রূপবান যুবক হারমাফ্রোডিটাসের। প্রণয়কাতর সালমেসিস দেবতাদের কাছে প্রার্থনা শুরু করল। তার এই নিবিড় প্রেমকে চিরন্তন করতে করুণা ভিক্ষা করল। দেবতারা যেন হারমাফ্রোডিটাসের সঙ্গে তাকে চিরকালের জন্য মিলিত করে দেন। দেবতারা তার প্রার্থনা শুনলো - তারা তাদের দু'জনকে জুড়ে দিলো একই শরীরে। তারপর থেকে এই প্রাণীটি হয়ে গেল উভলিঙ্গ।

এদিকে উপনিষদ বলছে, সৃষ্টিকর্তার মনেও নাকি শান্তি ছিল না। সেই পুরাণ পুরুষ ভীষণ একা বোধ করছিলেন। কোন সুখ, আনন্দ ছিল না তাঁর । 'স বৈ নৈব রেমে, যস্মাদ একাকী ন রমেতে'। আনন্দের জন্য শেষমেশ দু'ভাগে ভাগ করে ফেললেন নিজেকে- নারী-পুরুষ, অর্থাৎ জায়া-পতি। পরবর্তী শাস্ত্রকারদের মনে উপনিষদের এই বিমূর্ত কল্পনা নিশ্চয়ই এমনভাবে ক্রিয়া করেছিল যার জন্য তারা নির্দেশ দিয়েছিলেন, একটি পুরুষ বা একটি নারী আলাদাভাবে কখনোই সম্পূর্ণ নয়। একটি পুরুষ বা একটি নারী মানুষরূপে অর্ধেক মাত্র। এই কারণেই কি পুরাণ-পুরুষ নিজেকে দ্বিধা ছিন্ন করছিলো? ছিন্ন দুই ভাগের মধ্যে পরস্পরের মিলিত হবার, সম্পূর্ণ হবার টান ছিল কি?

আমরা দেখতে পাই, মহাভারতের লেখক সম্পূর্ণ মনুষ্যরূপে নমস্কার করেছিলেন- 'নারী-নরশরীরায়' বলে। বিনত হয়েছিলেন, 'স্ত্রী-পুংসায় নমো'স্তুতে' বলে। পূর্ণাঙ্গ মানুষ রূপের এই বিমূর্ত শিব ভাবনার আদি রূপ খুঁজে পাওয়া যায় বৈদিক যম-যমীর মধ্যে। মাঝের চিন্তাটা আসে উপনিষদ পুরুষের ইচ্ছায়। আর শেষটা পাব বিভিন্ন পুরাণের অর্ধনারীশ্বর কল্পনায়।

দেখা যাক, ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ কী বলছে। এখানে বলা হয়েছে, অর্ধনারীশ্বরের জন্ম নাকি ব্রহ্মার রোষ থেকে। আগুনপানা তাঁর চেহারা। 'অর্ধনারী-নরবপুঃ'। জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই মিথুনীকৃত মূর্তিকে ব্রহ্মা আদেশ দিলেন- 'তুমি নিজেকে দ্বিধা বিভক্ত কর'। বলা মাত্রই সেই মিথুন দেবতা বিভক্ত করলেন নিজেকে। সৃষ্টি হলো পৃথক স্ত্রী, পৃথক পুরুষ। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, ঋষির কল্পনা এখানে এক থেকে দুই হচ্ছে আবার এক হবার টানে দুই থেকে এক হচ্ছে। অর্ধনারীশ্বরকে নিয়ে বেশ জনপ্রিয় একটি কিংবদন্তী প্রচলিত আছে, সেটি অনেকটা এরকম।

"একদা দেবতা ও ঋষিগণ কৈলাসে হর-পার্বতীকে প্রদক্ষিণ করছিলেন। ঋষি ভৃঙ্গী ছিলেন শিবের একনিষ্ঠ ভক্ত। তিনি পার্বতীকে অগ্রাহ্য করে শুধুমাত্র শিবকে প্রদক্ষিণ করতে থাকেন। ঋষি ভৃঙ্গীর এই স্পর্ধিত উপেক্ষায় পার্বতী অপমানিত বোধ করেন এবং ক্রুদ্ধ হয়ে ভৃঙ্গীকে নিছক চর্ম-আবৃত কঙ্কালে পরিণত করেন। ফলে ভৃঙ্গী দু-পায়ে দাঁড়াতেও অক্ষম হয়ে পড়েন। ভক্তের প্রতি এমন অবস্থা দেখে শিবের মায়া হয় । তিনি তাই ভৃঙ্গীকে তৃতীয় পদ দান করেন। কিন্তু পার্বতীর সম্মান রক্ষার্থ স্বয়ং পার্বতীর সঙ্গে একদেহ হয়ে তিনি অর্ধনারীশ্বর-রূপে অবস্থান করেন, যাতে ভৃঙ্গী পার্বতীকেও প্রদক্ষিণ করতে বাধ্য হন।"

পৌরাণিক উপাখ্যানে অর্ধনারীশ্বরের সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা আছে কালিকা পুরাণে (নবম দশম শতাব্দী)। যেখানে ফুটে উঠেছে সেই গৌরী মেয়েটির আকুলতা। যে মেয়ে প্রিয়তমের দিকে তাকালেই প্রিয়তমের মরমে ছায়া পড়ে। হ্যাঁ, মহাদেবের বুকে নারীর ছায়া দেখে ব্যাকুলা হলেন গৌরী। তার মনে হলো, অন্য কোনো রমণী বুঝি শিবের হৃদয় জুড়ে আছে। মহাদেব তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেন, ঐ ছায়া অন্য নারীর নয়, ওটি গৌরীরই ছায়া। শিবের আশ্বাস আর নিজের বিশ্বাস থাকার পরেও মন থেকে তার ভাবনা গেল না। যদি সত্যি অন্য কোনো নারী শিবের হৃদয় জুড়ে বসে! গৌরি কাতর হয়ে বললেন- 'আমি তোমাকে আরও কাছে পেতে চাই, স্বামী! সাহচর্যে ঠিক তোমার ছায়ার মতো। এমন দূরে, আলাদা করে নয়। তোমার সমস্ত অঙ্গের পরমাণুর স্পর্শ চাই আমি, যাতে তুমি বাঁধা পড়বে আমার নিত্য আলিঙ্গনে।' - 'সর্বগাত্রেণ সংস্পর্শং নিত্যালিঙ্গণ বিভ্রমম (কালিকাপুরাণ, ৪৫।১৪৯-১৫০)।' শিব বললেন - 'তবে তাই হোক'।

মুহূর্তেই ঈশ্বর-ঈশ্বরী পরস্পরের অর্ধেক শরীর হরণ করলেন। ধরা দিলেন অর্ধনারীশ্বর মূর্তিতে। ঋষিরা স্বস্তিবাচন করলেন। প্রণাম করলেন 'নমঃ স্ত্রীপুংসরূপায়'।

(পুনশ্চ : এই প্রতিবেদনের দ্বিতীয় ভাগ পড়তে চোখ রাখুন জ্যোতিষ বিভাগে। আগামীকাল এই প্রতিবেদনের দ্বিতীয় তথা শেষ ভাগ প্রকাশিত হবে।)

lok-sabha-home
English summary
Some unknown-fact about 'Ardhanariswar'
For Daily Alerts

Oneindia - এর ব্রেকিং নিউজের জন্য
সারাদিন ব্যাপী চটজলদি নিউজ আপডেট পান.

Notification Settings X
Time Settings
Done
Clear Notification X
Do you want to clear all the notifications from your inbox?
Settings X

Loksabha Results

PartyLWT
BJP+1353354
CONG+09090
OTH09898

Arunachal Pradesh

PartyLWT
BJP33437
JDU077
OTH01111

Sikkim

PartyWT
SKM1717
SDF1515
OTH00

Odisha

PartyWT
BJD112112
BJP2323
OTH1111

Andhra Pradesh

PartyWT
YSRCP151151
TDP2323
OTH11

WON

Dr. Sanjeev Kumar - YSRCP
Kurnool
WON
We use cookies to ensure that we give you the best experience on our website. This includes cookies from third party social media websites and ad networks. Such third party cookies may track your use on Oneindia sites for better rendering. Our partners use cookies to ensure we show you advertising that is relevant to you. If you continue without changing your settings, we'll assume that you are happy to receive all cookies on Oneindia website. However, you can change your cookie settings at any time. Learn more