সাইবার প্রতারণার জাল ছিন্ন করতে বড় সিদ্ধান্ত রাজ্যের, এবার প্রতিটি থানাতেই মিলবে সরাসরি প্রতিকার
রাজ্যে লাগামহীনভাবে বেড়ে চলা অনলাইন জালিয়াতি রুখতে এক বড়সড় ও সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ গ্রহণ করল প্রশাসন। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সাইবার প্রতারকরাও নিত্যনতুন ফাঁদ পাতছে। সাধারণ কর্মজীবী মানুষ থেকে শুরু করে অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ নাগরিক—কেউই রেহাই পাচ্ছেন না তাদের হাত থেকে। এই মারাত্মক সামাজিক সঙ্কটকে প্রতিহত করতে ময়দানে নামল রাজ্য সরকার। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে চোখের নিমেষে টাকা গায়েব করার এই চক্র ভাঙতে একগুচ্ছ নতুন পদক্ষেপের ঘোষণা করা হয়েছে।
সম্প্রতি নবান্ন সভাঘরে আয়োজিত পুলিশ আধিকারিকদের একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে এই বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর সরকার সাইবার অপরাধীদের কড়া সাজা দিতে বদ্ধপরিকর বলে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী জানান, প্রতি সপ্তাহে সরকারি জনতা দরবারে বহু অসহায় মানুষ জালিয়াতির শিকার হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। অতি সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষদের কষ্টার্জিত অর্থ এই আন্তর্জাতিক জালিয়াতি চক্রের খপ্পরে চলে যাওয়া সত্যিই গভীর উদ্বেগের বিষয়।

প্রতারকদের সবচেয়ে কুৎসিত রূপটি সামনে আসে যখন সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত অংশের মানুষদের নিশানা করা হয়। সরকারি বার্ধক্য ভাতা, বিধবা ভাতা কিংবা সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্পের সামান্য আর্থিক অনুদানটুকুও অ্যাকাউন্ট থেকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। অনেক অসহায় মানুষ ভাতার ফর্ম পূরণ করার পরই এমন ফাঁদে পড়ছেন। এই প্রান্তিক মানুষগুলি সাইবার প্রযুক্তি সম্পর্কে অনভিজ্ঞ হওয়ায় প্রতারকদের কাজ আরও সহজ হয়ে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিচার করেছে প্রশাসন।
আগে সাইবার অপরাধের অভিযোগ জানাতে নাগরিকদের জেলা সদর কিংবা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে অবস্থিত দূরবর্তী সাইবার সেলে যেতে হতো। কিন্তু এই নতুন উদ্যোগে রাজ্যের প্রতিটি স্থানীয় থানায় একটি করে নিবেদিত 'সাইবার সহায়তা কেন্দ্র’ বা হেল্পডেস্ক স্থাপন করা হচ্ছে। ভারত সরকার এবং রাজ্য সরকারের পারস্পরিক সমন্বয়ে এই হেল্প ডেস্কগুলি পরিচালিত হবে। এর ফলে প্রতারিত ব্যক্তিরা বিলম্ব না করে নিজ এলাকার থানাতেই দ্রুত অভিযোগ নথিভুক্ত করতে বা পরামর্শ নিতে পারবেন।
থানা স্তরে এই নতুন ব্যবস্থা নিখুঁতভাবে পরিচালনা করতে বিশাল পরিকাঠামো গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, এর জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত রকম পরিকাঠামোগত সহায়তা প্রদান করা হবে। জালিয়াতি চক্রের হদিশ পেতে থানাগুলিকে সর্বাধুনিক মানের অপরাধ-সন্ধানী যন্ত্রপাতি দেওয়া হবে। পাশাপাশি অপরাধের গুরুত্ব অনুধাবন করে হেল্পডেস্ক চালানো এবং তদন্তের গতি বাড়াতে প্রয়োজনে আরও নতুন কর্মী ও আইটি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করবে রাজ্য সরকার।
অভিযোগ নিয়ে কাজ করার আধুনিক কৌশল রপ্ত করানোর জন্য থানা স্তরের পুলিশ বাহিনীকে নিবিড় প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হচ্ছে। রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং এডিজি পদমর্যাদার উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা নিজেরাই এই বিশেষ প্রশিক্ষণ সেশনের তদারকি করবেন। কীভাবে সাইবার অপরাধীদের গতিবিধির উপর নজর রাখতে হয় এবং ডিজিটাল প্রমাণ সুরক্ষিত রাখতে হয়, তা পুলিশকে হাতেকলমে শেখানো হবে। এমনকী থানাগুলিতে কাজের মান উন্নত করতে সাইবার সেলে দ্রুত অত্যন্ত সিনিয়র অফিসার নিয়োগ করার ভাবনাও চলছে।
জালিয়াতির শিকার হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টার ভূমিকা অপরাধ দমনে অত্যন্ত জরুরি। পুলিশ ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের পরিভাষায় একে 'গোল্ডেন আওয়ার’ বলা হয়। টাকা অ্যাকাউন্ট থেকে কেটে যাওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব অভিযোগ দায়ের করলে সেই টাকা অন্যত্র ট্রান্সফার করা বা তুলে নেওয়া আটকানো যায়। মুখ্যমন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, অপরাধ ঘটার পর দ্রুত অভিযোগ জানালে চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব। কিন্তু দুই বা চার ঘণ্টা পেরিয়ে গেলে তদন্ত অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী হয়ে ওঠে।
চুরি যাওয়া টাকা ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে কার্যকর থাকা '১৯৩০’ হেল্পলাইন নম্বরটির ভূমিকা আরও বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি রাজ্য সরকারের পরিচালনায় সচল রয়েছে 'সহযোগ’ পোর্টাল। এই দুই বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতারিত গ্রাহকরা ঘরে বসেই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পন্ন করতে পারেন। তবে শুধু সাধারণ ব্যাঙ্কিং প্রতারণাই নয়, বর্তমান সময়ে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে সংঘটিত জটিল এবং হাই-টেক আর্থিক কেলেঙ্কারি ও জালিয়াতি আটকাতেও এই বিশেষ ব্যবস্থাগুলির সাহায্য নেওয়া হবে।
আইনশৃঙ্খলা অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে পুলিশ বাহিনীকে 'সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ও প্রোটোকল মেনে’ কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। অপরাধকে নির্মূল করতে পুলিশ যাতে কোনও রাজনৈতিক বা বাহ্যিক চাপ ছাড়াই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তার নিশ্চয়তা দিয়েছে প্রশাসন। একই সঙ্গে আইন হাতে তুলে নেওয়া দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধেও কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। কর্তব্যরত পুলিশ আধিকারিকদের উপর যদি তদন্তকালে বা আইনশৃঙ্খলা সামলাতে গিয়ে হামলা চালানো হয়, তবে কঠোরতম ধারায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাইবার অপরাধের এই ক্রমবর্ধমান জাল রুখতে রাজ্যের এই সামগ্রিক বন্দোবস্ত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। থানা পর্যায়ে সরাসরি সাইবার হেল্পডেস্ক চালু হওয়ার ফলে গ্রামীণ ভারতের সাধারণ মানুষের পক্ষেও জালিয়াতির কবলে পড়ার পর আইনি প্রতিকার পাওয়া সহজ হবে। সমন্বয়ের অভাব কাটিয়ে উঠে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় চালিত এই নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা রাজ্যে সাইবার প্রতারণা অনেকটাই কমাতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।












Click it and Unblock the Notifications