মমতা-শিবিরকে জোর ধাক্কা! তৃণমূলের দখল নিতে দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনে হাজির ঋতব্রত ব্রিগেড
তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে ক্ষমতার লড়াই এবার রাজধানী দিল্লিতে গিয়ে পৌঁছল। নিজেদের 'আসল তৃণমূল’ দাবি করে দলের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর সহকর্মীরা। বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ১০ সদস্যের এক প্রতিনিধি দল। এই বৈঠকের পরই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে রীতিমতো চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে।
কমিশনের বৈঠক থেকে বেরিয়ে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য কোনও ধরনের আইনি বা প্রযুক্তিগত দ্বন্দ্বের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন। অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে তিনি দাবি করেন, আসল তৃণমূল কংগ্রেস আসলে তাঁরাই। তাঁর কথায়, দলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ক, একাধিক প্রাক্তন মন্ত্রী, জেলা পরিষদের সদস্য এবং কাউন্সিলররা তাঁদের সঙ্গেই রয়েছেন। ফলে দলের প্রতীক বা নাম নিয়ে কোনও নতুন করে দাবি জানানোর বা বিতর্কের প্রয়োজনই নেই, কারণ স্বাভাবিকভাবেই তাঁরাই দল এবং সংগঠনের মূল চালিকাশক্তি।

তবে আপাতদৃষ্টিতে কোনো বিরোধ নেই বলে দাবি করা হলেও, কেন এই প্রতিনিধি দল হঠাৎ নির্বাচন কমিশনের দরবারে হাজির হল, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আদতে নিজেদের আইনি অবস্থান মজবুত করতেই এই তৎপরতা। এর আগে কলকাতার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতরে গিয়ে ঋতব্রত শিবিরের বিধায়করা তাঁদের 'বিশেষ অধিবেশনে’র নথিপত্র জমা দিয়ে আসেন। আজ সেই সূত্রেই কমিশনের দ্বারস্থ হলেন তাঁরা।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, গত ২২ জুন তাঁদের শিবিরের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ ডেলিগেট অধিবেশনে আয়োজন করা হয়েছিল। সেই অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে দলের অভ্যন্তরীণ স্তরে ব্যাপক রদবদল ঘটানো হয়। বিশিষ্ট নেতা অরূপ রায়কে দলের নতুন চেয়ারপারসন হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে এবং কোষাধ্যক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আখরুজ্জামানকে। এই রদবদলের বিষয়টি তাঁরা ঘটনার ঠিক পরের দিনই নির্বাচন কমিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছিলেন।
নির্বাচন কমিশনের তিন সদস্যের ফুল বেঞ্চের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জ্ঞানেশ কুমার। তাঁর সঙ্গেই এদিন দিল্লিতে দীর্ঘ আলোচনা করেন ঋতব্রতর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলটি, যার মধ্যে ৯ জন বিধায়ক এবং ১ জন প্রাক্তন মন্ত্রী সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। কয়েক মিনিটের এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ঋতব্রত বলেন, তাঁরা কমিশনের কাছে নিজেদের স্পষ্ট ও বাস্তব অবস্থান তুলে ধরেছেন এবং কমিশনও অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে তাঁদের লিখিত ও মৌখিক বক্তব্য শুনেছে।
কিন্তু রাজ্য রাজনৈতিক মহলে আসল ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি পারস্পরিক বিরোধী বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। একদিকে তিনি যেমন দাবি করছেন যে দলের প্রতীক বা নাম নিয়ে কোনো বিবাদের জায়গা বা তর্কের প্রশ্নই নেই কারণ তাঁরাই আসল দল, অন্যদিকে তেমনই আবার বলছেন যে কমিশন তাঁদের দাবিদাওয়াগুলি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই যদি কোনো বিতর্কই না থেকে থাকে, তবে কোন দাবি নিয়ে কমিশনের কাছে দরবার করা হলো, তা নিয়ে ধন্দ তৈরি হয়েছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, যখনই কোনো রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন প্রকাশ্যে আসে, তখন প্রতীক ও নামের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য ক্ষমতার প্রদর্শন করতে হয়। ১৯৭১ সালের প্রতীক আদেশের অধীনে কমিশন বিচার করে কোন গোষ্ঠীর পিছনে জনপ্রতিনিধি ও সাংগঠনিক শক্তির আসল জোর রয়েছে। ঋতব্রতরা সম্ভবত এই আইনি প্রক্রিয়াটি খুব ভালোভাবেই জানেন এবং সেই কারণেই আগাম নিজেদের রাজনৈতিক ও আইনি ভিত্তি তৈরি করার লক্ষে নির্বাচন কমিশনে এই তৎপরতা দেখিয়েছেন।
দ্বিধাবিভক্ত দলের লড়াইয়ে আর্থিক ক্ষমতা এক বিরাট অংশ। বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, ঋতব্রতদের মূল লক্ষ্য হলো কালীঘাটের অর্থাৎ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের হাত থেকে দলের যাবতীয় আর্থিক তহবিল এবং মূল নির্বাচনী প্রতীক 'জোড়া ফুল’-এর নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়া। বর্তমানে দলের যাবতীয় ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ও তহবিল যে কোষাধ্যক্ষের অধীনে থাকে, সেই পদের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের নবনির্বাচিত কোষাধ্যক্ষ আখরুজ্জামানের হাতে তুলে দেওয়াই তাঁদের প্রধান দাবি। এর ফলে কালীঘাট শিবিরের আর্থিক কর্তৃত্ব খর্ব করা সম্ভব হবে।
কমিশন যদি শেষ পর্যন্ত ঋতব্রত শিবিরের দাবি মেনে নেয়, তবে কালীঘাট শিবিরের পক্ষে দল পরিচালনা করা চরম সংকটের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। কারণ দলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের আইনি অধিকার চলে গেলে প্রাত্যহিক এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠবে। এই কারণেই বিরোধী শিবিরের এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত মাস্টারস্ট্রোক হিসেবে দেখছে ওয়াকিবহাল মহল। কমিশন জানিয়েছে, তারা এই আবেদন দ্রুত খতিয়ে দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানাবে।
আপাতত বল এখন ভারতের নির্বাচন কমিশনের কোর্টে। জাতীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্তরে এই সিদ্ধান্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি অনেকটাই বদলে দিতে পারে। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের দীর্ঘ লড়াইয়ের ফসল এই দলকে রক্ষা করতে আইনি ও রাজনৈতিক স্তরে কী কৌশল নেন, আর অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিটি কীভাবে কমিশনের মাধ্যমে নিজেদের দখলদারি সুপ্রতিষ্ঠিত করে, তা দেখার জন্য ধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে রাজ্য রাজনীতি।












Click it and Unblock the Notifications