অপ্রস্তুত অবস্থায় হাঁকপাঁক করে বাংলা দখল অভিযান, নাজেহাল বিজেপি
অপ্রস্তুত অবস্থায় হাঁকপাঁক করে বাংলা দখল অভিযান, নাজেহাল বিজেপি
ভাঙনের আগে এ রাজ্যে যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল কংগ্রেস। ১৯৯৮ সালে কার্যত কংগ্রেসের মূলস্রোতকে ভেঙে নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপরও এ রাজ্য থেকে বামফ্রন্ট সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতায় আসতে তাদের সময় লেগেছে ১৩ বছর। এ রাজ্যে সাংগঠনিকভাবে শক্তিহীন বিজেপি। এই দলের রাশ যতদিন আরএসএসের হাতে ছিল, ততদিন একরকম। সীমিত হলেও সাংগঠনিক জোর ছিল। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই নরেন্দ্র মোদি ঠিক করেছিলেন আরএসএসের নিয়ন্ত্রণ থেকে দলকে বের করে আনতে হবে। ক্ষমতায় এসে সেটাই করেছেন। মুখে কিছু না বললেও, হাবেভাবে তেমন কিছু না দেখালেও, আস্তে আস্তে দলের প্রবীণ নেতাদের কোণঠাসা করেছেন। সুকৌশলে সরকারকে আরএসএসের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করেছেন। এখন মোদি যেভাবে ভাবছেন, দলকে সেভাবেই চালাচ্ছেন। সঙ্গে পেয়েছেন অমিত শাহকে। এবার পশ্চিমবঙ্গকে পাখির চোখ করেছেন নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহরা। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলের সঙ্গে সমানে সমানে টক্কর দিতে গেলে দলের সাংগঠনিক শক্তি জোরদার হতে হয়। গত ১০ বছরে এ রাজ্যে বিজেপিকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার তেমন কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং অধিকাংশ পুরনো নেতা-কর্মী ব্রাত্য হয়ে গিয়েছেন। নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর যাঁরা এই পার্টিতে এসেছেন তাঁদের হাতেই এখন পার্টির রাশ। তবে তাঁরাও ক্ষমতাহীন। সবটাই চলছে নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশে।

স্থানীয় নেতাকর্মীদের আমল না দিয়েই প্রার্থী বাছাই
প্রথম দফার নির্বাচন প্রায় ঘাড়ের ওপর। তারপর এক মাসের মধ্যেই ভোট শেষ। অথচ বিজেপি ২৯৪টা আসনের মধ্যে এখনও পর্যন্ত ১৭১ জন প্রার্থী বাছাই করে উঠতে পারেনি। যাঁদের নাম প্রকাশ করা হয়েছে তাঁদের নিয়ে তোলপাড় কর্মী ও সমর্থক মহল। অনেক প্রার্থীকেই তাঁরা মানতে নারাজ। বহু আসনে প্রার্থী বদলের দাবি উঠেছে। ক্ষোভ বিক্ষোভ ভাঙচুর চলছে। স্থানীয় নেতারা পদে পদে হেনস্তা হচ্ছেন। কেন্দ্রীয় নেতাকেও তালাবন্ধ করে আটকে রাখা হচ্ছে। জেলায় জেলায় পার্টি অফিসে বিক্ষোভ আছড়ে পড়েছে। বাদ যায়নি কলকাতায় হেস্টিংসে দলের নির্বাচনী কার্যালয়ও। সোমবার দুপুরে হাওড়ার পাঁচলা এবং উদয়নারায়ণপুরে প্রার্থী বদলের দাবিতে চড়াও হন কিছু কর্মী সমর্থক। তাঁদের দাবি পার্টির লোকেদের বাদ দিয়ে এই দুটি আসনে তৃণমূল থেকে সদ্য আসা দুজনকে প্রার্থী করা হয়েছে। রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় এখানে তাঁদের প্রার্থী করার উদ্যোগ নিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত রাজ্য নেতারা বিক্ষুব্ধদের এই বলে আশ্বস্ত করেছেন, দাবির কথা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। হুগলির সিঙ্গুরে এবারে প্রার্থী হতে না পারায় তৃণমূল বিধায়ক ৯০ ছুঁই ছুঁই রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য দলে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে সিঙ্গুরে প্রার্থী করা হয়েছে। তা নিয়েও তুমুল ক্ষোভ। প্রার্থী বদলের দাবি। এরকম আরও অনেক। মাত্র ১২৩ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা হতেই এই অবস্থা। এখনও ১৭১ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা হওয়া বাকি। তারপর যে কী অবস্থা হবে তা অনুমান করা যায়।

দলবদলু এবং তারাদের ওপরেই ভরসা রাখছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব
অথচ বঙ্গ বিজয়ে তৃণমূলের দলছুটদের ওপর অনেক বেশি ভরসা রাখছে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। প্রচার কর্মসূচীতে শুভেন্দু অধিকারী অথবা রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়কে যতখানি প্রচারের আলোয় আনা হচ্ছে, ততখানি গুরুত্ব পাচ্ছেন না বিজেপির স্থানীয় নেতারা। আর ভরসা বিনোদন জগতের তারকাদের ওপর। যদিও শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায় এবং কিছুটা অঞ্জনা বসু ছাড়া আর খুব একটা আকর্ষণীয় নাম নেই। সৌরভ গাঙ্গুলীকে আনার অনেক চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু তাঁকে টেনে আনা যায়নি। এখন আবার চেষ্টা চলছে মিঠুন চক্রবর্তীকে যদি কোনওভাবে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করানো যায়। তনুশ্রী চক্রবর্তী, পায়েল সরকার কিংবা যশ দাশগুপ্ত এমন আকর্ষণীয় নাম নয় যাদের টানে সাধারণ মানুষ এসে ভোট দিয়ে যাবে। তবুও দীর্ঘদিন ধরে পার্টির ঝান্ডা ধরে যাঁরা লড়াই চালিয়েছেন, তাঁদের বাদ দিয়ে এঁদের ওপরেই ভরসা রেখেছেন নরেন্দ্র মোদিরা। ফলে একদিকে যেমন ক্ষোভ-বিক্ষোভ, অন্যদিকে অনেকেই বসে যাচ্ছেন।

শুধু কথায় চিঁড়ে ভিজবে না
পশ্চিমবঙ্গের মতো একটা রাজ্য দখল নেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ। যে রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর শাসনকালের ১০ বছরে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা বিরাট প্রাপক গোষ্ঠী গড়ে তুলেছেন। সেটাই তাঁর ভোট ব্যাংক। এই ভোটব্যাংকে থাবা বসাতে হলে তাঁদের সাধারণ মানুষকে এমন কিছু পাইয়ে দিতে হবে যা মমতার দেওয়া সুযোগ-সুবিধার থেকে বেশি। বিজেপির একমাত্র শক্তি কেন্দ্রে তাদের সরকার। ডবল ইঞ্জিন সরকার হলে তারা এ রাজ্যকে সোনার বাংলা তৈরি করে দেবে। এসব কথায় চিঁড়ে ভিজবে বললে মনে হয় না। আগেও বারবার বলেছি, আবারও বলছি, প্রতিশ্রুতি নয় প্রাপ্তি চাই। না হলে তাঁদের ইচ্ছে ছুঁচোর হাতি গেলার স্বপ্ন হয়ে থাকবে।












Click it and Unblock the Notifications