যুদ্ধবিরতি শর্ত লঙ্ঘন ইজরায়েলের, ফের হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণা ইরানের

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ হরমুজ প্রণালীতে (Strait of Hormuz) সব ধরনের জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা করল ইরান। সেদেশের সর্বোচ্চ সামরিক মহলের যৌথ কমান্ড 'খাতা-আল-আম্বিয়া’ সদর দফতর এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) যৌথভাবে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েল যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত বারবার লঙ্ঘন করার প্রতিবাদেই এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হল।

ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা মেহর-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ লেবাননে যে বহুচর্চিত যুদ্ধবিরতির সমঝোতা তৈরি হয়েছিল, মার্কিন প্রশাসন ও ইজরায়েলি সেনা তা ক্রমাগত অমান্য করছে। ইরানি সামরিক কমান্ড সামগ্রিক বিষয়টিকে একটি বড় বিপত্তি ও বিশ্বস্ততার অবমাননা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। চুক্তি লঙ্ঘন করার পাল্টা জবাবে অত্যন্ত কৌশলগত এই আন্তর্জাতিক জলপথের সমস্ত প্রবেশদ্বার বন্ধ করার ঘোষণা করেছে আইআরজিসি।

ভৌগোলিক ও ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে হরমুজ প্রণালী বিশ্বের খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের অন্যতম প্রধান লাইফলাইন হিসেবে বিবেচিত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম তেল উৎপাদনকারী দেশগুলি থেকে উৎপাদিত তরল সোনা এশিয়া, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার বাজারে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এই সংকীর্ণ জলপথ এক অনন্য ভূমিকা পালন করে। প্রতিদিন আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি হওয়া অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বিপুল পরিমাণ অংশ মূলত ওমান এবং ইরানের মধ্যবর্তী এই জলসীমা দিয়েই পরিবাহিত হয়ে থাকে।

আইআরজিসির তরফ থেকে একটি বিশেষ বিবৃতি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে এই এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ইরানি নৌ ও বিমানবাহিনী সতর্ক করে বলেছে, কোনো দেশের সরকার বা বেসরকারি নৌপরিবহন সংস্থা যদি এই নির্দেশ অমান্য করে তবে তাদের জাহাজের নিরাপত্তার পূর্ণ দায়িত্ব তাদেরই বহন করতে হবে। ইরান এই কঠোর অবস্থানকে 'প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া’ বলে অভিহিত করেছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে বলে হুঁশিয়ারি এসেছে।

হরমুজ প্রণালীতে চরম উত্তেজনার আবহে মার্কিন সরকারের তরফ থেকে অবশ্য সুর কিছুটা নরম রাখা হয়েছে। এই ঘটনার ঠিক পরপরই আমেরিকার উপ-রাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স ফক্স নিউজ চ্যানেলকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৪ দফা সমঝোতা প্রস্তাবটি কাজ করবে সে ব্যাপারে তারা এখনও আশাবাদী। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক নৌ-যান চলাচল সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো কোনো নিশ্চিত প্রমাণ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলির কাছে নেই।

হরমুজ প্রণালীর জলরাশিতে সামরিক রণহুঙ্কারের সমান্তরালে সুইজারল্যান্ডের মাটিতে একটি অত্যন্ত জরুরি কূটনৈতিক উদ্যোগ শুরু হতে চলেছে। পরমাণু চুক্তি নিয়ে ইরানের সঙ্গে নতুন করে বোঝাপড়া ও মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি পুনঃস্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে আলোচনার প্রথম পর্বে অংশ নিতে চলেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এই উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক মধ্যস্থতা বৈঠকে ওয়াশিংটনের প্রতিনিধিত্ব করবেন বলে জানা গিয়েছে।

এর আগে, মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে লেবানন ও গাজা উপত্যকায় ক্রমাগত রক্তক্ষয়ী হিংসা ও সীমান্ত সংঘর্ষ বৃদ্ধির কারণে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আলোচনার এই জটিল প্রক্রিয়া থেকে সাময়িকভাবে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। তবে সম্প্রতি ইজরায়েলি সেনাবাহিনী এবং লেবাননের হিজবুল্লা গোষ্ঠীর মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয় এবং পুনরায় আলোচনার পটভূমি প্রস্তুত হয়। যদিও হরমুজ প্রণালী বন্ধের এই আকস্মিক ঘোষণা সেই শান্ত প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎকে আবার বড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল।

ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সরকারিভাবে স্পষ্ট করেছেন যে, ইরানের উচ্চপর্যায়ের একটি কূটনৈতিক দল ইতিমধ্যেই জেনেভার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় দূরদর্শনকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বাঘাই বলেন, যেকোনো সমঝোতা বা চুক্তির কার্যকারিতা কাগজে-কলমে নয়, बल्कि তা প্রয়োগের ময়দানে প্রমাণিত হয়। ইরান এই দফায় আমেরিকার বাস্তব পদক্ষেপ খতিয়ে দেখে তবেই তাদের পরবর্তী নীতি নির্ধারণ করবে।

এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির অন্যতম পরাশক্তি ভারত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বিপুল জ্বালানি আমদানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের খনিগুলির ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। ভারতের তেল ট্যাঙ্কারগুলির অর্ধেকেরও বেশি এই হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করে ভারতের বিভিন্ন বন্দরে পৌঁছায়। এই আন্তর্জাতিক নৌপথ অবরুদ্ধ হলে ভারতের প্রধান পরিশোধন সংস্থাগুলির সমস্যা বাড়বে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে পেট্রোল ও ডিজেলের খুচরো দাম রেকর্ড ছুঁতে পারে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের দৈনিক যাতায়াতের বাজেটে।

বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের ধারণা, ইরান আসলে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হতে চলা প্রস্তাবিত কূটনীতিতে নিজেদের বেশি শক্তিশালী প্রতিপন্ন করতে এই কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জলপথ বন্ধ করার এই সামরিক চাপকে দরাদরি করার মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায় তেহরান। তবে কোনো পক্ষের সামান্যতম একটি উসকানিমূলক ভুল পদক্ষেপ এই স্পর্শকাতর অঞ্চলে একটি বৃহত্তর বহুপাক্ষিক যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে।

এমতাবস্থায়, সারা বিশ্বের নজর এখন রয়েছে সুইজারল্যান্ডের বহুল প্রতীক্ষিত ভারত ও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের ভবিষ্যতের দিকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব চরম মতপার্থক্য ভুলে এই সংকটের একটি শান্তিপূর্ণ উপায়ে মীমাংসা করতে পারেন কি না, এবং হরমুজ প্রণালীতে পুনরায় নিরাপদ জাহাজ চলাচল শুরু হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে এই কূটনৈতিক দৌত্যই এখন একমাত্র ভরসা।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+