মহা শিবরাত্রির আগে জেনে নিন ভারতের পবিত্র ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গের কাহিনী
ভারতের পবিত্র ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গের কাহিনী
রাত পোহালেই দেশজুড়ে পালিত হবে মহা শিবরাত্রি। যাকে অনেকে 'শিবের মহারাত’ হিসাবেও চিহ্নিত করে থাকেন। শিবরাত্রি কথাটি এসেছে শিব ও রাত্রির সমন্বয়ে। অর্থাত্ যে রাত শিবের উদ্দেশ্যে নিবেদিত। এক বছরে প্রতি মাসে একটি করে মোট ১২টি শিবরাত্রি পালন করা হয়। তার মধ্যে মহা শিবরাত্রি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এদিন ভগবান শিব ও মা পার্বতীর বিয়ে হয়েছিল বলে মনে করা হয়। প্রত্যেক বছর এই উৎসব পালন করা হয় হিন্দু মাসের ফাল্গুনে ১৩তম রাত ও ১৪তম দিনে। এ বছর মহা শিবারাত্রি ১১ মার্চ বৃহস্পতিবার পালন করা হবে।
এই উৎসবের প্রস্তুতি চলছে জোর কদমে এবং বেশিরভাগ শিব–পার্বতীর মন্দিরগুলিকে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। গোটা দেশজুড়ে বিবিধ উপায়ে পালন করা হয় এই মহা শিবরাত্রি। এই সময় ধর্মপ্রাণ হিন্দুদের বিশ্বাস যে মহাকাশের শক্তি পৃথিবীতে তার অবেদনশীল বাহুতে আশ্রয় প্রার্থনা করে অজ্ঞ ব্যক্তিকে আলোকিত করতে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়। মহা শিবরাত্রীতে হিন্দু ত্রয়ী ভগবান শিবকে শ্রদ্ধার সঙ্গে পুজো করা হয়। শিবকে পুরুষত্বের রূপ বলে মনে করা হয় এবং বেশিরভাগ হিন্দু নারী শিবের মতো স্বামী পেতে চান। এই মহা শিবরাত্রীর তাৎপর্য হল ভগবান শিব অরিদ্র নক্ষত্র রাতে লিঙ্গ হিসাবে প্রকাশ পেয়েছিলেন। ভারতে ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গ রয়েছে যা শিবের প্রতীক হিসাবে ধরা হয়। দেখে নেওয়া যাক সেই ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গ কোথায় কোথায় অবস্থিত, যাঁর পুজো পুরুষ বা মহিলা সারা জীবন ধরে করতে পারবেন।

সোমনাথ
সমস্ত জ্যোতির্লিঙ্গগুলির মধ্যে গুজরাতের সোমনাথ মন্দিরের জ্যোতির্লিঙ্গকে সবচেয়ে পবিত্র বলে মনে করা হয়। দ্বাদশ তীর্থক্ষেত্রে সফরের সময় এখানেই প্রথম আসেন তীর্থযাত্রীরা। ভারতের বিভিন্ন কিংবদন্তিতে এই মন্দিরের উল্লেখ রয়েছে। সোমনাথ শব্দটির অর্থ 'চন্দ্র দেবতার রক্ষাকর্তা'। সোমা বা চন্দ্র দেবতার সোনা দিয়ে মন্দির নির্মাণের পর এটি ১৬ বার ধ্বংস ও পুর্ননির্মাণ করা হয়।

মল্লিকার্জুন
মল্লিকার্জুন জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির হল দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের কৃষ্ণা নদীর ওপর সবচেয়ে উঁচু পর্বত শ্রীশৈলমে অবস্থিত একটি শিবমন্দির। এটি শিবের পবিত্রতম বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দিরের অন্যতম। আদি শঙ্করাচার্য শিবানন্দ লাহিড়ী রচনা করেছিলেন তাই এই ঐশ্বরিক স্থান শ্রীশাইল নামেও পরিচিত। শ্রীশাইল তার দারুণ স্থাপত্য কাজের জন্য বিখ্যাত। পুরাণে দক্ষযজ্ঞে সতীর দেহত্যাগের গল্প পাওয়া যায়। কথিত আছে মল্লিকার্জুনে সতীর উপরোষ্ঠ পড়েছিল।

মহাকালেশ্বর
মধ্যপ্রদেশের উজ্জ্বয়িনিতে রুদ্রসাগর হ্রদের তীরে অবস্থিত। এই মন্দিরের শিবলিঙ্গটিকে স্বয়ম্ভু বা শিবের সাক্ষাৎ-মূর্তি মনে করা হয়। লিঙ্গের মুখ দক্ষিণ দিকে এবং এটাই একমাত্র মন্দির যেখানে গর্ভগৃহের ছাদের ওপর রয়েছে শ্রীযন্ত্র।

ওমকারেশ্বর
নর্মদা নদীর একটি দ্বীপ মান্ধাতা বা শিবপুরিতে ওঙ্কারেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ ও মামল্লেশ্বর মন্দির অবস্থিত। ওমকারেশ্বর জনপ্রিয় ওমকারা ও অমরেশ্বর মন্দিরের জন্য। দ্বীপের আকৃতির সঙ্গে ওম চিহ্নের মিল পাওয়া যায় বলে বিশ্বাস করেন এখানকার বাসিন্দারা।

কেদারনাথ
উত্তরাখণ্ডের সর্বোচ্চ হিমালয়ে অবস্থিত অন্যতম জ্যোতির্লিঙ্গ কেদারনাথ। এটি মন্দাকিনি নদীর কাছে অবস্থিত, মন্দিরটি অধিকাংশ সময় বরফে আবৃত থাকে। কঠিন রাস্তা ও আবহাওয়ার পরিস্থিতি অনুকূল না থাকার কারণে মন্দিরে যেতে গেলে পায়ে হেঁটে যেতে হয়। বছরের মধ্যে ছয় মাস মন্দির বন্ধ থাকে।

ভীমশঙ্কর
অনেকেই মনে করেন যে ভীমশঙ্কর লিঙ্গ মহারাষ্ট্রের পুনের কাছে অবস্থিত। যদিও প্রকৃত ভীমশঙ্কর লিঙ্গ কোথায় অবস্থিত এ নিয়ে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে। শিবপুরাণ অনুযায়ী, ভীমশঙ্কর মন্দির পূর্ব ভারতের অসমের গুয়াহাটিতে অবস্থিত। কিন্তু লিঙ্গ পুরাণ অনুযায়ী, ওড়িশার ভীমপুরে এই ভীমশঙ্কর মন্দির রয়েছে, যা ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে অন্যতম।

কাশী বিশ্বনাথ
সমস্ত জ্যোতিলির্ঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে পবিত্রতম হল কাশী বিশ্বনাথ, এটি বারাণসীর গঙ্গা নদীর ধারে অবস্থিত। বিশ্বনাথ বা গোটা মহাবিশ্বের শাসক হিসাবে ধরা হয় বিশ্বনাথের শিবলিঙ্গকে। বেনারস শহরটি ৩৫০০ বছরের বেশি সময় ধরে সবচেয়ে পুরনো নথিভুক্ত ইতিহাস শহর হিসাবে পরিচিত।

ত্রিম্বাকেশ্বর
মহারাষ্ট্রের নাসিকে গোদাবরী নদীর কাছে অবস্থিত ত্রিম্বাকেশ্বর মন্দির। এখানে তিনমুখী লিঙ্গ রয়েছে, যা হিন্দু ত্রয়ী ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের প্রতীক। তবে অতিরিক্ত জল ব্যবহারের কারণে লিঙ্গের আকারে হ্রাস পাচ্ছে। লিঙ্গ ক্ষয়ের বিষয়টি প্রতীকী হিসাবে বিবেচিত হয় কারণ এটি সময়ের সঙ্গে জীবনের দূরে সরে যাওয়াকে প্রতিফলন করে।

বৈদ্যনাথ
বৈদ্যনাথ জ্যোতির্লিঙ্গের অবস্থানও বিতর্কিত। ঝাড়খণ্ডের দেওঘরের বৈদ্যনাথ মন্দিরটি জ্যোতির্লিঙ্গ আখ্যাপ্রাপ্ত। এটিই একমাত্র তীর্থ যা একাধারে জ্যোতির্লিঙ্গ ও শক্তিপীঠ। বৈদ্যনাথ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যান্য দাবিদার মন্দিরগুলি হল হিমাচল প্রদেশের কাংড়া জেলার বৈজনাথ শিবধাম ও মহারাষ্ট্রের বিড জেলার পারলি বৈজনাথ। পৌরাণিক চরিত্র রাবণের সঙ্গে বৈদ্যনাথ লিঙ্গ প্রতিষ্ঠার গল্পটি জড়িত।

নাগেশ্বর
এই জ্যোতির্লিঙ্গের অবস্থানও বিতর্কিত। জ্যোতির্লিঙ্গের দাবিদার মন্দিরগুলি উত্তরাখণ্ডের আলমোড়ার কাছে জাগেশ্বর, গুজরাতের দ্বারকা ও মহারাষ্ট্রের হিঙ্গোলি জেলার অন্ধ নাগনাথে অবস্থিত

রামেশ্বরম
তামিলনাড়ুতে অবস্থিত ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম রামেশ্বরম মন্দির। সীতা উদ্ধারের পরে ফিরে এসে, লিঙ্গ রূপে শিবের আরাধনা করেন রামচন্দ্র। রাবণকে বধ করে তিনি যে ব্রহ্মহত্যা করেছিলেন, সেই পাপ খণ্ডনের জন্যই শিবের আরাধনা করেন। বর্তমানে তামিলনাডুর সেই স্থানই হিন্দু তীর্থ হিসেবে গণ্য হয়।

ঘৃষ্ণেশ্বর
ঘৃষ্ণেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির বা ঘুশ্মেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির হল হিন্দু দেবতা শিবের পবিত্রতম বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দিরের অন্যতম। এটি ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের আওরঙ্গাবাদ থেকে ৩০ কিলোমিটার এবং দৌলতাবাদ (দেবগিরি) থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে ইলোরা গুহার কাছে অবস্থিত। কথিত আছে, ভগবান শিব এক মাকে তাঁর মৃত সন্তানকে ফিরে পেতে সহায়তা করেছিলেন এবং সেই মা ও গ্রামবাসীদের অনুরোধে শিব সেখানে জ্যোতির্লিঙ্গরূপে অবস্থান করেন।












Click it and Unblock the Notifications