পেলের শেষ কলকাতা সফর কীভাবে সুনিশ্চিত হয়েছিল? ৩৭ বছরের বন্ধুকে হারিয়ে মুহ্যমান ফুটবল সম্রাটের ম্যানেজার

কলকাতায় ফুটবল সম্রাট পেলে এসেছিলেন ২০১৫ সালে। সেই শেষ। যাঁর উদ্যোগে সেবার পেলে কলকাতা তথা বাংলায় এসেছিলেন তিনি হলেন ক্রীড়া সংগঠক শতদ্রু দত্ত। পেলের প্রয়াণের পর শতদ্রু সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলে ধরেছেন নানা সুখস্মৃতি। পেলের সঙ্গে প্রথম দেখা থেকে শুরু করে কলকাতা সফর নিয়ে নানা অভিজ্ঞতার কথা।

২০১৫ সালের জুনে পেলের সঙ্গে শতদ্রুর সাক্ষাৎ

শতদ্রু ফেসবুকে লিখেছেন, ২০১৫ সালে সম্ভবত জুন মাসে সাও পাওলোয় বেলার দিকে আমাকে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল যে কিং-এর সঙ্গে দেখা করতে পারব। এটা শোনার পর রীতিমতো উত্তেজনা অনুভব করছিলাম। খুব অভিজাত এলাকায় পেলের ফ্ল্যাট। ১৪ তলা-বিশিষ্ট পেন্টহাউস। পেলের সেই ফ্ল্যাটে প্রবেশ করতেই দেখলাম বড় বড় ক্যামেরা-সহ শ্যুটিংয়ের নানা সরঞ্জাম রাখা। প্রথমে আমাদের লবিতে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলা হলো। এরই মধ্যে পেলের ম্যানেজার পেপিতো ভিতরে প্রবেশের জন্য আহ্বান জানালেন। ঢুকে দেখি বিশালাকৃতি একটি টেবিল, সেখানেই নীল শার্ট পরে বসে আছেন পেলে। একটি স্ক্রিপ্ট পড়ছিলেন। তাঁর হাসি দেখে মুগ্ধতার শেষ ছিল না। সেলেবদের দেখে অমন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ি না। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও আমি বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম। এরপর চরণ স্পর্শ করতেই তিনি আমাকে বুকে টেনে নিলেন।

কলকাতা নিয়ে কথা

শতদ্রুর কথায়, পেলে জানতেন আমি কলকাতা থেকে গিয়েছি। তিনি আমাকে দেখেই বললেন, কলকাতায় যখন গিয়েছিলাম কসমস ক্লাবের হয়ে খেলতে তখন প্রচুর মানুষ বিমানবন্দরে ছিলেন। যা দেখে কসমসের এক ইতালীয় ফুটবলার তো রীতিমতো ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলেন। মিনিট ১৫ কথা হয়েছিল। সেই সময়ই উঠে আসে ইডেনের সেই ম্যাচের কথা। পেলে বলছিলেন একটি দলের সঙ্গে খেলা ছিল। শতদ্রু মনে করিয়ে দেন সেই ক্লাবের নাম ছিল মোহনবাগান। শুনেই পেলে বলেন, "হ্যাঁ, হ্যাঁ মোহনবাগান।" শতদ্রু তখন পেলেকে বলেন ক্যালকাটা থেকে কলকাতা হওয়ার ফাঁকে কতটা বদলে গিয়েছে আমাদের প্রিয় শহর। পেলে মন দিয়ে শতদ্রুর কথা শোনেন, ধারণা করতে থাকেন কলকাতা সম্পর্কে।

মুখে লেগে থাকত হাসি

মুখে লেগে থাকত হাসি

শতদ্রুর সঙ্গে আলাপচারিতার ফাঁকে তাঁকে কাজুবাদাম খেতে বলে শ্যুটিংয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন পেলে। কয়েকটি ক্ষেত্রে রি-টেকের জন্য বলা হলেও এতটুকু বিরক্ত হচ্ছিলেন না। মুখে লেগে ছিল চেনা হাসি। শতদ্রুর সময়, ওই কিছুক্ষণের জন্য আমি ছিলাম শ্যুটিংয়ের পরিচালক। যা বলেছি, হাসিমুখেই তা মেনে শ্যুটিংয়ের কাজ চালিয়ে গিয়েছেন পেলে। ফ্ল্যাট থেকে বেরনোর আগে পেলে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন। তাঁর স্ত্রী ভারত সম্পর্কে অনেক কিছুই জানেন। বছর দুই আগে পুত্র এডিনহোর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে জেনে দুজনেই খুশি হয়েছিলেন।

জার্সি সই

বেশ কয়েকটি জার্সিতে সই করানোর ছিল। পেলে একে একে সই করতে শুরু করেছিলেন জার্সিতে। শতদ্রু জানান, আমার নিজের, পরিবার, বন্ধু ও আত্মীয়স্বজনদের জন্য কয়েকটি জার্সিতে সই করাই। এ ছাড়াও দিদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও দাদা সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্যও দুটি জার্সিতে পেলের সই নিয়েছিলাম। জার্সি সইয়ের সময়েও কোনও বিরক্তি লক্ষ্য করেনি ফুটবলের সম্রাটের মধ্যে।

কলকাতায় পেলে

কলকাতায় পেলে

এরপর ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে কলকাতায় পেলের পদার্পণ। যারই প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল কয়েক মাস আগে সাও পাওলোর বাড়িতে। শতদ্রু জানিয়েছেন, এমিরেটসের বিমানে তিনি এসেছিলেন। আমি এগজিট গেটের কাছেই ছিলাম। যে মুহূর্তে আমাকে পেলে দেখলেন বুকে টেনে আলিঙ্গন করলেন। আবারও মুগ্ধ হলাম তাঁর হাসিতে। তিন দিনের কলকাতা সফর এগিয়েছিল মসৃণভাবেই। তাঁর পিঠে সমস্যা ছিল। তাই যেখানেই গিয়েছি আমার কাঁধে সব সময় হাত রেখেছেন পেলে। একজন অসাধারণ, নিপাট ভালো মানুষ। মারাদোনার সঙ্গে পেলেকেও মিস করব। দুই কিংবদন্তিকেই কলকাতায় আনতে পেরেছি, এই অভিজ্ঞতা আজীবন মনে গেঁথে থাকবে।

পেলেকে হারিয়ে নিঃসঙ্গ পেপিতো

পেলের প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গেই ৩৭ বছরের এক বন্ধুত্বেরও ইতি ঘটল। পেলের সেই ম্য়ানেজার তথা বন্ধু পেপিতো। যখন পেলের মৃত্যুসংবাদের কথা ছড়িয়ে পড়ছে সংবাদমাধ্যমে, শতদ্রু উদ্বিগ্ন হয়ে পেলের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চান তাঁর ম্যানেজারের কাছেই। উত্তর এসেছে কিছু দেরিতে। তবে প্রায় চার দশকের বন্ধু ও সঙ্গীকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান পেপিতো হোয়াটসঅ্যাপেই জানান, আমি আজ ভাইকে হারালাম। জীবনের কঠিন বাস্তব সত্য যে মানতেই হবে।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+