• search
For Quick Alerts
ALLOW NOTIFICATIONS  
For Daily Alerts

ইনক্রেডেবল ভূটান! মাত্র চার দিনে যেন স্বর্গ দর্শন

শিয়ালদহ থেকে রাত ১০টা ০৫-র দার্জিলিং মেল।

ঢাউস ট্রলি, খাবারের ব্যাগ আর জলের বোতল টানতে টানতে গলদঘর্ম অবয়বে এস ওয়ান বার্থে উঠে পড়লাম। টিকিটের সঙ্গে সিট নম্বর মিলিয়ে লাগেজগুলি যথাস্থানে রেখে একটু থিতু হতে না হতেই লম্বা হর্ন বাজালেন ড্রাইভার। মা, বাবা, আত্মীয় পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, সর্বোপরি কলকাতা ছেড়ে দুগ্গা দুগ্গা বলে রওনা হলাম, টুওয়ার্ডস ভূটান।

হিমালয়ের বুকে ছোট এই দেশের রূপের চর্চা নাকি বিশ্বের সর্বত্র। সে রূপের সাক্ষী হওয়ার রোমাঞ্চ নিয়ে সেদিনের রাত নিদ্রাহীন কাটল। ঘণ্টা দেড়েক লেটে রান করা দার্জিলিং মেল পরের দিন দুপুর দেড়টায় হাসিমারা পৌঁছল। ভারত-ভূটান বর্ডার জয়গাঁও-তে হোটেল বুক করা ছিল আগে থেকে। তৈরি ছিল ভ্রমণ সূচিও। হাসিমারা স্টেশন থেকে জয়গাঁও পর্যন্ত সারথী হল মারুতি ওমনি।

চা বাগানের বুক চিড়ে ৪৫ মিনিটের রাস্তা পেরিয়ে, যখন হোটেলে পৌঁছলাম, তখন পেটে ছুঁচোর কীর্তন শুরু হয়েছে। ওমনির চালক নায্য ভাড়ার থেকে ৫০ টাকা বেশি চাইলেও, তা নিয়ে কথা না বাড়িয়ে ক্লান্ত শরীর নিয়ে হোটেলের রুমের দিকে পা বাড়ালাম। জামা-কাপড় ছেড়ে স্নান সেরে বেরোতে না বেরোতেই মেনু কার্ড নিয়ে হাজির রুম সার্ভিস বয়। মাছ-ভাতের থালি অর্ডার করার আধ ঘণ্টার মধ্যেই লাঞ্চ রেডি। ঘরেই খাওয়া-দাওয়া সেরে ভূটানে প্রবেশের ছাড়পত্র জোগাড় করতে সেদেশের ইমিগ্রেশন অফিসের দিকে রওনা হলাম। সঙ্গে নিলাম পাসপোর্ট, আধার কার্ড এবং ফটো।

নিরাপত্তার খুব কড়াকড়ি না থাকলেও সে দেশে নিয়ম চলে নিয়মেরই খেয়ালে। জ্যাম-জটে নাজেহাল ভারতের জয়গাঁও ছেড়ে যখন ভূটানের ফুন্টশোলিংয়ে পা রাখলাম, তখন দুপুর পেরিয়ে বিকেল। মন ভালো করে দেওয়া পরিচ্ছন্নতায় সব ক্লান্তি এক নিমেষে দূর হল। সাফ-সুতরো ইমিগ্রেশন অফিসে পারমিশনের জন্য দাঁড়াতে হল না অনেকক্ষণ। কাজ সেরে বাবা-মা, আত্মীয় পরিজনদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ভূটান সরকার প্রদত্ত ফোনের সিম সংগ্রহ করে আবার জয়গাঁও-র হোটেলে ফিরলাম।

ভূটানে হোম স্টে, হোটেল, এমনকী যাত্রা পথের সারথীও আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। গাড়ির চালক রাত আটটায় হোটেলের ঘরের কড়া নাড়লেন। পরনে টিসার্ট, হাফ প্যান্ট, মাথায় টুপি, পায়ে স্নিকার্স। হৃদয় ভোলানো হাসি, মিষ্টভাষী তাসি (চালকের নাম)চার দিনের এই ট্যুরে কবে, কোথায় নিয়ে যাবেন, তা তখনই জানালেন। বললেন, তিনি সকাল আটটায় গাড়ি নিয়ে হোটেলে পৌঁছবেন।

অবশেষে ভূটানের পথে

অবশেষে ভূটানের পথে

সেই মতো সকাল সকাল উঠে স্নান সেরে তৈরি হয়ে নিলাম। ঘড়ির কাঁটা আটটা ছুঁতেই বেজে উঠল বেল। দরজা খুলতেই দেখলাম একগাল হাসি নিয়ে দণ্ডায়মান তাসি। গুড মর্নিং স্যার, আর ইউ রেডি, সারথীর সেই নরম সুরের কথা এখনও কানে বাজে।

৮.১৫। রওনা হল ঝাঁ-চকচকে মারুতি ওয়াগনার। ডেস্টিনেশন থিম্পু। আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র হওয়ায় এখানে সব দেশের পর্যটকদের আনাগোনা। তাই বাংলা তো দূর অস্ত, হিন্দিও কোন ছাড়, স্পোকেন ইংলিশের ভিত শক্ত না হলে সেদেশে ঘুরতে গিয়ে বিপদে পড়তে হবে। যাই হোক হিন্দি-ইংলিশ মিশিয়ে কাজ চালিয়ে নিলাম।

রাজধানী থিম্পু

রাজধানী থিম্পু

ফুন্টশোলিং থেকে ভূটানের রাজধানী থিম্পুর দূরত্ব ১৪৭.৩ কিমি। প্রায় চার ঘণ্টার আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা যেন স্বর্গের সিঁড়ি। চড়াই-উতরাইয়ের রাজপথ, গভীর থেকে গভীরতর খাদ, পাইনের সারি, কনকনে ঠান্ডা, মেঘের কোলে আলো-আঁধারির খেয়ালে ভেসে ছুটে চলার সময় তাসির কাছ থেকে জেনে নিলাম সেদেশের ইতিহাস, ভুগোল ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। যাত্রাপথে ফুল-পাতা-ধূলিকণা বুকে নিয়ে শ্বেত বরফের অভ্যর্থনা মনে রোমাঞ্চ জাগায়। মাঝে এক স্থানে ঝরনার নিচে গাড়ি দাঁড় করালেন তাসি। বললেন, স্যার গিভ মি টেন মিনিটস। তারপর সটান গাড়ি থেকে নেমে গেলেন সারথী। ডিকিতে রাখা ব্যাগ থেকে কী একটা যেন বের করলেন। চট করে সেটা পরে আবার স্টিয়ারিং ধরতে চলেও এলেন তাসি।

জানলাম, গলা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা কোমরের কাছে দড়ি দিয়ে আটকানো যে পোশাকটি তিনি গায়ে গলালেন, সেটির নাম কিরা। ভূটানের জাতীয় পোশাক। স্থানীয়রা মূল শহরে তা না পরে ঢুকলে নাকি শাস্তি অবধারিত। তাই থিম্পু ঢোকার আগেই কিরা পরে আগেভাগে সাবধানতা অবলম্বন করলেন তাসি। রাস্তা খারাপ থাকায় বারোটার বদলে একটায় পৌঁছলাম হোম স্টে-তে। মূল শহর থেকে অনেকটাই উপরে, যেখান থেকে গোটা থিম্পু দেখা যায় বিলকুল।

প্রথম দিন

প্রথম দিন

শহরের অন্য নাগরিকদের মতো হোম স্টে-র মালকিনও দারুণ স্মার্ট ও আভিজাত্য পূর্ণ। মিনু শেরপার স্বামী সরকারি ইঞ্জিনিয়ার। উচ্চ শিক্ষিত মহিলা নিজেও। তবু শখেই নেমে পড়েছেন হোম স্টে-র ব্যবসায়। দুটি ঝাঁ-চকচকে গাড়ির মালকিন মিনু ম্যাডাম আবার আমার ট্যুর কনডাক্টরও। তাঁর সঙ্গে বসেই আগামী চার দিনের ভ্রমণ সফর ঠিক করে নিলেন তাসি। ততক্ষণে আমার লাঞ্চও কমপ্লিট। আর দেরি না করে সারথীর সঙ্গে বেরিয়েই পড়লাম নগর দর্শনে।

পাহাড়ের উপর পাহাড়, উত্তুঙ্গ পাথর রাজির নজরদারির মধ্যে দিয়েই এগিয়ে চলল গাড়ি। ট্রাফিকের বাড়াবাড়ি নেই, কারণ নিয়মনিষ্ঠ নাগরিকরাই রাস্তায় নিয়মের বিশ্বস্ত পাহাড়াদার। হুট-হাট রাস্তা পেরোনোর হিড়িক নেই। গাড়ি চলছে চল্লিশের গতিতে, তাই দুর্ঘটনা দূরস্ত। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তা, সাফ-সুতরো ঘরবাড়ি, দোকানপাট, সেনা-ছাউনি, স্কুল, হাসপাতাল, মার্কেট, মল পেরিয়ে এগিয়ে চলল তাসির রথ। এ কোথায় এলাম, মুখ থেকে বেরোতে শুনে সারথী বললেন, স্যার দিজ অনলি দ্য সিটি, মেন বিউটি অ্যাট দ্য টপ। এক জায়গায় মোড় ঘুরে সাপের মতো প্যাঁচানো রাস্তা দিয়ে উপরে উঠতে শুরু করলাম ধীরে ধীরে। যেখানে থামলাম, সেই জায়গার নাম কুনসেল ফোডরাং নেচার পার্ক। তার মুখ্য আকর্ষণ সোনা ও ব্রোঞ্জ দিয়ে তৈরি ১৬৪ ফুটের বুদ্ধা ডরডেনমা বা বুদ্ধ মূর্তির অবয়ব দেখতে আকাশ পানে চাইতেই হবে। তাসি জানালেন, প্রতিবেশী চিন থেকেও নাকি এই বুদ্ধের দর্শন পাওয়া যায়।

গাড়ি থেকে নামতেই কনকনে হিমেল ঝাপটা যেন হাড়ে হাড়ে কাঁপুনি ধরালো। কাঁপতে কাঁপতেই সেই বুদ্ধ মূর্তি কাছে পৌঁছে তো থ। বিশ্বের অন্যতম উচ্চতম বৌদ্ধ মূর্তি বানিয়েও রাজার দেশ এমন আশ্চর্য শান্ত থাকে কী করে! প্রাণ ভরে ছবি তুলে এক সন্তুষ্টি নিয়ে যখন কুনসেল ফোডরাং নেচার পার্ক ছাড়লাম তখন দুপুর পেরিয়ে বিকেল। পাহাড়ে সন্ধ্যা নামে তাড়াতাড়ি। তাই গাড়ির গতি বাড়িয়ে তাসি আমায় নিয়ে এল শহরের প্রাণকেন্দ্রে, রাজা বা ড্রুক জিগমে খেসার নামগেল ওয়াংচুকের প্রসাদ বা জঙ্খার কাছে। তার পাশেই প্রশাসনিক ভবন ও মিউজিয়ামের স্থাপত্য সেদেশের পরিচয়বাহক।

আচমকাই শুরু হল ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। দৌড়ে গিয়ে গাড়িতে উঠলাম। সারথী জানালেন, আজকের মতো শেষ। বাকি কাল সকালে। ফেরার পথে থিম্পুর অভিজাত ও জনপ্রিয় মার্কেটে ঢেলে বিক্রি হওয়া কমলালেবু জলের দামে কিনলাম। গাড়িতেই কয়েকটা সাবাড় করলাম। বাকিটা রেখে দিলাম। হোম স্টেতে পৌঁছনোর আধ ঘণ্টার মধ্য ঘরে চা নিয়ে হাজির হলেন রুম সার্ভিস গার্ল। রোদ ও মেঘ তখনও পাহাড়ের কোলে খেলে চলেছে আপন খেয়ালে। ঘরের জানলা খুলতেই কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া জীবনের সব দুঃখ, হতাশা ও না পাওয়ার আক্ষেপকে নিয়ে উধাও হল। ধীরে ধীরে আঁধার নামাল। সুস্বাদু মাছ, ভাত, ডাল, রুটি, মিক্সড ভেজ উদরস্ত করে ঘরের বাইরে বেরিয়ে দেখলাম, আকাশের তারারা নেমেছে পাহাড়ে। মেঘে মেঘে ঢাকা জোছনাহীন সেই রাতই যেন মায়াবী প্রেমিকা।

দ্বিতীয় দিন

দ্বিতীয় দিন

থিম্পুর সর্বোচ্চ পয়েন্ট থেকে দুই পাহাড়ের মাঝে আস্ত শহরটা পর্যবেক্ষণ করা কী কম সৌভাগ্যের। তারপর একে একে ন্যাশনাল মেমোরিয়াল ছোর্টেন, মোটিথাং তাকিং (জাতীয় পশু) সংরক্ষণ স্থল কাম চিড়িয়াখানা, ডেছেন ফোডরাং মনেস্ট্রি, ন্যাশনাল লাইব্রেরি, ন্যা্শনাল ইনস্টিটিউট জোরিং ছুসুম (স্থানীয় শিল্প ও কারুকার্যের স্থল), উইকেন্ড মার্কেট, ১২ শতকের ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ মন্দির চানগাংখা হাখাং, ত্রাসি ছো জোং (পারফরমিং এরেনা) দেখে শব্দ হারালাম। মাঝে এক ঘণ্টার ব্রেক। চটপট লাঞ্চ সেরে বেরিয়ে পড়লাম ডোচুলা পাসের পথে।

থিম্পু থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে ভূটানের সর্বোচ্চ মাউন্টেন পাসে (৩১০০ মিটার) উঠতে না উঠতেই শুরু হল ঝিরিঝিরি তুষারপাত। মূহুর্তে কালো পিচের রাস্তা হল সাদা। আবার রৌদ্রজ্বল দিনে ডোচুলা পাসের মুখ্য আকর্ষণ নাকি পাহাড়ের উপর পাহাড়। অসংখ্য, অদ্ভুত তার সৌন্দর্য। দুটো জ্যাকেট, কানে টুপি, হাতে গ্লাভস পরে গাড়ি থেকে নেমেই পড়লাম। ভূটানের চতুর্থ রাজা জিগমে সিংগে ওয়াংচুকের সম্মানে ১০৮টি স্মরণ স্তুপা তৈরি করেন কুইন মাদার দরজি ওয়াংমো ওয়াংচুক। গৃহযুদ্ধে শহিদ হওয়া ভূটানের সেনানিদেরও স্মরণ করা হয় এখানেই। চতুর্দিকে বরফের রাজি, হিমেল হাওয়া। তারই মধ্যে ডোচুলা মাউন্টেন পাসের সৌন্দর্য্য চেষ্টা করেও ভোলা সম্ভব নয়।

তৃতীয় দিন

তৃতীয় দিন

পাহাড়ের রানী ভূটান তোর্সা, ওয়াং, মো, পারো সহ বিভিন্ন নদী বা ছু (ভূটানি ভাষায়) দ্বারা বেষ্টিত। নদীর নামে শহরও পরিচিত। থিম্পুর পাট চুকিয়ে পরের দিন সকালে তারই মধ্যে অন্যতম সুন্দরী পারো শহরের দিকে রওনা হলাম। ভারত ও জাপানের সহযোগিতায় তৈরি আঁকাবাঁকা জাতীয় সড়কের ধার দিয়ে বয়ে চলা তোর্সা ও পারো নদীর জাংশান পেরিয়ে সুগা দুমোসা, কাসটানোপসিস ইন্ডিকা, পাইন, ফার, রডোডেনড্রনের রূপ শরীরে মেখে এগিয়ে চলল গাড়ি।

হা ভ্যালিকে পিছনে ফেলে ঘণ্টা চারেকের রাস্তা পেরিয়ে পারো শহরে পৌঁছতেই স্বাগত জানাল বরফাবৃত গাংখার পুয়েনসাম (ভূটানের সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ)। শহরের নির্মানে ইউরোপীয় ধাঁচ পরিলক্ষিত। সেখানকার রাস্তাঘাট-দোকানপাটও রয়েছে আধুনিকতার নিশান। হোটেলে লাগেজ রেখে, চা খেয়েই বেরিয়ে পড়লাম সেখানকার মুখ্য আকর্ষণ পারো ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট দর্শনের উদ্দেশে। চার দিকে পাহাড় বেষ্টিত অতি ছোট এই এয়ারপোর্টের সম্বল মোটে একটি রানওয়ে। তারই বুক কাঁপিয়ে বিমানের ওঠা ও নামা প্রত্যক্ষ করা যেন স্বর্গীয় প্রাপ্তি। ঠিক তখনই দুই পাহাড় ও মেঘের বেড়াজাল ভেদ করে সগর্জনে হুড়মুড় করে নেমে এলেন আকাশ দৈত্য। সেই মুহূর্তকে ক্যামেরাবন্দি না করে কী থাকা যায়। যন্ত্র সভ্যতা ও প্রকৃতির এমন অদ্ভুত মিল ভূ-বিশ্বে বিরল।

মন যেতে নাহি চায়। তবু কোনওমতো নিজেকে সামলে তাসির রথে রওনা হলাম ছে-লালা পাসের অভিমুখে। লোকমুখে শোনা, মূল শহর থেকে অনেকটাই ওপরে ওই জায়গায় নাকি তাবড় পাহাড়ের সম্মেলন বসে। কিন্তু বিধি যে বাম। কিছু দূর গিয়ে আটকে গেল গাড়ি। তাসি জানালেন, গত রাত থেকে চলা লাগাতার বরফপাতে রাস্তা গেছে আটকে। বরফ কেটে আরো উপরে উঠতে গেলে জীবনের ঝুঁকি অবধারিত। অগত্যা ব্যর্থ মনোরথ নিয়ে ফিরে আসাটাই সমীচীন মনে হল। ফেরার আগে দুহাত ভরে বরফ মেখে আঁশ মেটালাম।

পরের ডেস্টিনেশন, ড্রুগেল জং। শোনা যায়, কোনও এক কালে ভূটানের এই এলাকা ছিল চিনের দখলে। জেদের বসেই এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে চিনাদের এলাকা ছাড়া করেন তুলনামূলক কম শক্তিধর অথচ নিয়মানুবর্তী ভূটানিরা। সেদিন বন্ধু হিসেবে হাত বাড়িয়েছিল ভারত। এহেন ড্রুগেল জংয়েই ছিল অভিজাত সভ্যতার বাস। কোনো এক রাতে রুষ্ঠ দাবানলে হার মানে ওই শহর। পড়ে থাকে ওই দুর্গের ছিটেফোটা কিছু স্মৃতি। ভস্মীভূত সেই শহরকেই নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে ভূটান সরকার।

টাইগার নেস্ট

টাইগার নেস্ট

পাহাড় কেটে বানানো ঝুলন্ত তাকসাং পালপুগ মনাস্ট্রি টাইগার নেস্ট নামে বহুল প্রচলিত। কথিত আছে, পদ্মসম্ভবা বা গুরু রিনপোচে নামে এক বৌদ্ধ ভিক্ষু ও পরিব্রাজক তিব্বত থেকে বাঘের পিঠে এই পাহাড়ে এসে তপস্যা শুরু করেছিলেন। তার স্মৃতিতেই এই মনাস্ট্রির নাম দেওয়া হয়েছে টাইগার নেস্ট।

আবার অন্য এক সূত্রের দাবি, তিব্বতের রাজা ইয়েসে সোগ্যালর স্ত্রী ছিলেন পদ্মসম্ভবার শিষ্যা। গুরুদক্ষিণা দিতে সেই তিনিই বাঘিনীর রূপ ধারণ করে পদ্মসম্ভবাকে পিঠে নিয়ে এই পাহাড়ে পৌঁছেছিলেন। তবে পুরান যাই বলুক, ভূটানের রাজা তেনজিন রাবগে যে ১৬৯২ সালে এই মনাস্ট্রি তৈরি করেছিলেন, সে বিষয়ে প্রত্যেকে একমত। ১৯৯৮ সালে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এই মনাস্ট্রির কিছু বহুমূল্য স্মৃতি নষ্ট হয়ে যায়। সেগুলি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

ভূটানের সবচেয়ে পবিত্র স্থান। আর সেখানে পৌঁছনো কী কম ঝক্কির কথা! বিপদ সঙ্কুল নাতিদীর্ঘ আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে উপরে ওঠার সময় অসতর্ক হলে বিপদ অবশ্যম্ভাবী। সবশেষে খাদের কিনারে আটশোরও বেশি সিঁড়ির চড়াই ও উতরাই যাত্রাপথকে আরো রোমাঞ্চকর বানায়। মনে সাহস জুগিয়ে টিকিট কেটে যাত্রা শুরু করলাম। সেদিন সকাল থেকেই পারো শহর ঢাকা পরেছিল কালো মেঘের আস্তরণে। কিছু দূর উঠতেই আকাশ থেকে নামতে শুরু করল ছেঁড়া তুলোর মতোই সূক্ষ, শান্ত তুষার কণা। নিমেষে সবুজ বনানী সফেদ চাদরে মুখ ঢাকল। লাল পথ, ধুলিকনা, নুড়ি, পাথর, শ্যাঁওলার সঙ্গে সাদা জলকণাদের সেকি গলাগলি। সেই মুহূর্তের দোসর হল কুয়াশা।

বরফাবৃত বনে ঢাকা নিঝুম, একাকী সেই সময় যেন না কাটে, ভাবতে ভাবতেই পিচ্ছিল চড়াই, উতরাই, খাড়াই সন্তর্পনে পেরিয়ে অবশেষে পৌঁছনো গেল বাঘের বাসায়। ঢুকে মনে হল, দিগন্ত জোড়া নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যেও আশ্চর্য শান্ত এই স্থান যেন এক অন্য পৃথিবী। ধ্যানে মগ্ন বৌদ্ধ ভিক্ষু, অন্ধকার ঘরে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা প্রদীপের নিচে যেন অপার শান্তির বাস। শহরের কোলাহল, হাসি, কান্না, ভাব, ভালোবাসা মেখে বড় হওয়া বান্দা এমন নীরবতায় হারাতে চাইবে বারবার।

চোখে, মুখে, মনে এক অদ্ভুত তৃপ্তি নিয়ে এবার নিচে নামার পালা। কাদায় মাখামাখি পিচ্ছিল পথ ধরে নামতে সময় লাগল সাড়ে তিন ঘণ্টা। তাতে কী, যা দেখিলাম, জন্ম জন্মান্তরে ভুলিব না। সেই সুখ স্মৃতি নিয়ে তাসির গাড়িতে উঠলাম। পৌঁছলাম হোটেলে। স্নান করে খাওয়া-দাওয়া করে এক ঘুমে সন্ধ্যা। বাইরের আকাশ তখন পরিষ্কার। স্থির তারাদের দিকে তাকিয়ে কী যে ভাবছিলাম, তা বলতে পারবো না। আচমকাই বেজে উঠল মুঠো ফোন। তাসি জালালেন, সকাল সাতটায় গাড়ি নিয়ে হোটেলে হাজির হবেন।

ডেস্টিনেশন জয়গাঁও টু কলকাতা।

English summary
Bhutan, heaven near West Bengal, a must visit for Bengalees
For Daily Alerts
চটজলদি খবরের আপডেট পান
Enable
x
Notification Settings X
Time Settings
Done
Clear Notification X
Do you want to clear all the notifications from your inbox?
Settings X
We use cookies to ensure that we give you the best experience on our website. This includes cookies from third party social media websites and ad networks. Such third party cookies may track your use on Oneindia sites for better rendering. Our partners use cookies to ensure we show you advertising that is relevant to you. If you continue without changing your settings, we'll assume that you are happy to receive all cookies on Oneindia website. However, you can change your cookie settings at any time. Learn more