বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের জেরে বাংলায় বিপর্যস্ত চিংড়ি চাষ, প্রভাব পড়েছে চাষিদের ওপর

বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের জেরে বাংলায় বিপর্যস্ত চিংড়ি চাষ, প্রভাব পড়েছে চাষিদের ওপর

একে তো করোনা ভাইরাসের জেরে লকডাউনের প্রভাব তার ওপর ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের ফলে পশ্চিমবঙ্গের চিংড়ি শিল্পের সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। সম্প্রতি এই ঘূর্ণিধড়ের দাপটে বাংলার অধিকাংশ গ্রামই তছনছ হয়ে গিয়েছে।

আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলা

আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলা

ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের পর তিন সপ্তাহ কেটে গিয়েছে। গত তিন দশকে বাংলায় এরকম ধ্বংসাত্মক ঝড় কেউ দেখেনি, যা বঙ্গোপসাগর থেকে উৎপন্ন হয়েছিল। এই ঝড় পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশায় ২০ মে আসে, কিন্তু ঝড়ের ধাক্কা সামলে উঠতে পারেনি এখনও মানুষ। পশ্চিমবঙ্গে ৯৮ জনের প্রাণ গিয়েছে এবং জমিতে নোনা জল ঢুকে যাওয়ার ফলে অনেক কৃষকের জীবিকাই নষ্ট হয়ে গিয়েছে।

আম্ফান চিংড়ি চাষি ও তাঁদের জীবিকাকে ধ্বংস করে দিয়েছে

আম্ফান চিংড়ি চাষি ও তাঁদের জীবিকাকে ধ্বংস করে দিয়েছে

চিংড়ি চাষের সঙ্গে যুক্ত ৩৯ বছরের জবা মণ্ডল একেবারে ভেঙে পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘‌ওটা ঘূর্ণিঝড় ছিল না রাক্ষস ছিল, যে এসে আমাদের জীবন ও জীবিকাকে বিভীষিকাময় করে তুলেছে। আমাদের মাটির বাড়ি জলের নীচে অর্ধেক ডুবে গিয়েছে এবং ভাসমান পলিথিন শিট ও ঘরের জিনিসপত্রগুলিই সর্বনাশের একমাত্র অবশেষ। প্রাকৃতির এই দুর্যোগের পরও আমরা বাঁচার চেষ্টা করছি কিন্তু আমাদের উপার্জনের রাস্তা একেবারে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা আমাদের চিংড়ি চাষ হারিয়ে গিয়েছে। আমাদের আক্ষরিক অর্থে বেঁচে থাকার জন্য ভিক্ষা করতে হবে।'‌ টিয়াপাড়া গ্রামের (‌সুন্দরবনের হাসনাবাদ উন্নয়ন কমিউনিটি ব্লকের অন্তর্গত)‌ বাসিন্দা জবা গত এক দশক ধরে চিংড়ি চাষের সঙ্গে যুক্ত। তিনি তাঁর পুকুরে প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকার চিংড়ি মজুত করে রেখেছিলেন কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ে একটি বাঁধ ভেঙে যায় এবং কাছের ইছামতী নদী থেকে নোনতা জল ঢুকে পড়ে। জবা বলেন, ‘‌ঘরের মধ্যে জল ঢোকার শব্দে আমাদের ঘুম ভেঙে যায়। জলস্তরের বৃদ্ধি দেখে আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। আমরা সবকিছু ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করি। আমরা বেঁচে যাই কিন্তু ক্ষতি হয় হাজার হাজার চিংড়ি মাছের, যেটি আমাদের জীবিকা অর্জনের প্রধান মাধ্যম ছিল।'‌

চিংড়ি চাষিরা অসহায় হয়ে পড়েছেন

চিংড়ি চাষিরা অসহায় হয়ে পড়েছেন

তবে জবা একা নন, টিয়াপাড়া ও তার আশপাশের প্রায় ৮ হাজার চিংড়ি চাষি এই ঘূর্ণিঝড়ে তাঁদের উপার্জন হারিয়েছেন। যার জন্য এই ধ্বংস সেই ঘূর্ণিঝড়কে সকলে দানব বলে অভিহিত করেছেন। ম্যানগ্রোভ দিয়ে ঢাকা ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতার জন্য পরিচিত সুন্দরবন এলাকাতেই অধিকাংশ চিংড়ি চাষিরা থাকেন, তাঁরা জানিয়েছেন তাঁরা প্রাকৃতিক দুর্যোগে অভ্যস্ত কিন্তু আম্ফানের মতো কখনও কোনও ঝড় দেখেননি। ৩১ বছরের বিশ্বজিত দাস, যিনি পারিবারিক চিংড়ি ব্যবসায়ী, তিনি বলেন, ‘‌মরশুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা প্রায় ১.‌২ মিলিয়ন মূল্যের লার্ভা ছেড়েছিলাম। আমাদের ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে আগাম সতর্ক করা হয়েছিল কিন্তু এটা খুবই সাধারণ ঘটনা এখানে এবং মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু আমরা বিস্মিত। ঝড়ের আওয়াজ আমাদের কানে ধাঁধা লাগিয়ে দেয়। বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ফলে নোনা জল আমাদের মাঠের মধ্যে ঢুকে পড়ে। আমরা আমাদের চিংড়িগুলিকে হারিয়ে ফেলি। আমরা চিংড়ি তচাষের জন্য বেসরকারি অর্থদাতার থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়েছিলাম যাতে ব্যবসা ঠিকঠাক চললে সেই অর্থ ফেরত দিয়ে দেব। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল।'‌

কৃষিজমিকে চিংড়ি চাষে রূপান্তর

কৃষিজমিকে চিংড়ি চাষে রূপান্তর

রাজ্যের অন্যান্য অংশের চাষিদের তুলনায় সুন্দরবনের অধিকাংশ চাষি তাঁদের কৃষিজমিকে চিংড়ি চাষে রূপান্তর করেছে। এই এলাকার বর্ষা ও মৌসুমি আবহাওয়া ঐতিহ্যবাহী কৃষিকাজের চেয়ে চিংড়ি চাষে বেশি লাভ দিয়েছে। খাপুকার গ্রামের চিংড়ি চাষি ৫২ বছরের নরেন্দ্র নাথ মণ্ডল বলেন, ‘‌রাজ্যের অন্যান্য অংশের মতো, আমাদের একাধিক ফসল নেই, কারণ ভূগর্ভস্থ জল লবণাক্ত। আমাদের ফসলের জন্য বর্ষার উপর নির্ভর করে থাকতে হয় তবে চিংড়িতে লাভ অর্জন করেছে, কারণ ধানের চেয়ে এর মার্জিন কয়েকগুণ বেশি।'‌

 চিংড়ি চাষের সঙ্গে ক্ষতি চিংড়ি ব্যবসারও

চিংড়ি চাষের সঙ্গে ক্ষতি চিংড়ি ব্যবসারও

আম্ফান কেবল কৃষকদের ব্যবসাই ক্ষতি করেনি, চিংড়ির খাদ্য ও চিংড়ি সরবরাহকারী ও রপ্তানি ব্যবসাকেও ক্ষতি করেছে। চিংড়ি ক্ষেত্র নামে পরিচিত এই অঞ্চলটিতে করোনা ভাইরাসের মহামারি ও লকডাউন ব্যবস্থা সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভারী বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে। কৃষকরা জানিয়েছেন যে মার্চ ও এপ্রিল মাসে সাধারণত তাঁদের পুকুরে চিংড়ি ছাড়ার মরশুম কিন্তু লকডাউন ও ঘূর্ণঝড় তাঁদের ব্যবসায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। প্রসঙ্গত, পশ্চিমবঙ্গ দেশের বৃহত্তম চিংড়ি উৎপাদনকারী অঞ্চল। সামুদ্রিক পণ্য রফতানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এমপিইডিএ) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭-১৮ সালে রাজ্যটিতে প্রায় ৫৫,২১১ হেক্টর জমিতে প্রায়, ৭৬,৫৩৪ টন চিংড়ি উৎপাদন হয়েছিল।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+