• search
For Quick Alerts
ALLOW NOTIFICATIONS  
For Daily Alerts

মকর সংক্রান্তিতে টুসু পরবে মাতোয়ারা জঙ্গলমহল, গানে গানে কুড়মিদের জীবন কাহিনি

সারা দেশ যখন মকর সংক্রান্তির দিন বিভিন্ন নদী সাগরে স্নান করে পুণ্য অর্জন করতে চাইছেন, সেই সময়ে জঙ্গলমহলের জেলাগুলি মেতেছে টুসু পরবে। ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুরের মত জেলাগুলিতে রীতিমতো আনন্দ করে পালিত হয় এই দিন। দীর্ঘ দিন ধরেই পালিত হয়ে আসছে এই পরব বা উৎসব।

মকর সংক্রান্তিতে টুসু পরবে মাতোয়ারা জঙ্গলমহল, গানে গানে কুড়মিদের জীবন কাহিনি

পশ্চিম মেদিনীপুরের একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক গৌতম মাহাতোর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে কুড়মালি ভাষার স্বীকৃতির পর তা পঠনপাঠনের বিষয় হিসাবে চালু করে হয়েছে ঠিকই কিন্তু এই জনজাতিটি রয়ে গিয়েছে সেই তিমিরেই। এদের রহন-সহন, খাদ্যাভ্যাস, আদব কায়দা এবং সর্বোপরী জীবনযাপনের একটা বড় অংশ জুড়ে বয়ে গ্যাছে প্রকৃতি প্রেম। এরা হিন্দু বা আর্য নয়। অনেক গবেষকের মতে এই জনজাতিটিও অন্যান্য আদিম জনজাতির মতোই টোটেমিক। অর্থাৎ এরা গোত্রে বিবেচিত নন, এরা গোষ্ঠীতে বিশ্বাসী। তাই এদের জীবনযাপন ও সংস্কৃতিতেও স্পষ্টভাবে ছাপ ফেলে প্রকৃতি। নানান ট্যাবু ও টোটেমদের মধ্যে প্রকৃতি তার গভীর প্রভাব আচ্ছাদিত করে রাখে। হাবার্ট একেই 'প্রেতবাদ' বলে চিহ্নিত করেছেন।

এই কুড়মি জনজাতির ভাষা ও জীবনের মতোই এদের পার্বণগুলিও ভিন্নতর স্বাদের এবং অদ্ভুত সুন্দরও।যেমন এই টুসু পরব পালিত হয় পৌষ সংক্রান্তির দিন। এই উৎসব এখন আর শুধুমাত্র কুড়মিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই উৎসব এখন সারা বাংলার উৎসব। কুড়মি লোকজীবনের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখের জীবনকাহিনী সবথেকে বেশী ধরা পড়ে যে গানে তা হল টুসু গান।

সনাতন ইতিহাস ও ঐতিহ্য যেমন ধরা পড়ে এই টুসু গানে, তেমনই গানে উঠে আসে বর্তমান প্রেক্ষিত। যেমন এই বছর এসেছে নাগরিকত্ব আইনের প্রসঙ্গ । গানে বলা হয়েছে, ' দেশের নিত্য লতুন আইন হচ্ছে/ রেশন, ভোটার, আধার কার্ডেও/ সঠিক প্রমাণ নাই হচ্ছে '। এই সঙ্গে বলা হয়েছে, ' সাত পুরুষ বাস করছি/ ইটার প্রমাণ দিব কার কাছে?'

অগ্রহায়ণ মাসের সংক্রান্তির সন্ধ্যাবেলায় গ্রামের কুমারী মেয়েরা একটি পাত্রে চালের গুঁড়ো লেপে তাতে তুষ রাখেন। তারপর তুষের ওপর ধান, কাড়ুলি বাছুরের গোবরের মন্ড, দূর্বা ঘাস, আল চাল, আকন্দ, বাসক ফুল, কাচ ফুল, গাঁদা ফুলের মালা প্রভৃতি রেখে পাত্রটির গায়ে হলুদ রঙের টিপ লাগিয়ে পাত্রটিকে পিড়ি বা কুলুঙ্গীর ওপর রেখে স্থাপন করা হয়। পাত্রের এই পুরো ব্যবস্থা প্রতিদিন সন্ধ্যার পরে টুসু দেবী হিসেবে পূজিতা হন। পৌষ মাসের প্রতি সন্ধ্যাবেলায় কুমারী মেয়েরা দলবদ্ধ হয়ে টুসু দেবীর নিকট তাঁদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক অভিজ্ঞতা সুর করে নিবেদন করেন ও দেবীর উদ্দেশ্যে চিঁড়ে, গুড়, বাতাসা, মুড়ি, ছোলা ইত্যাদি ভোগ নিবেদন করেন।

টুসু উৎসব পালনের সময় পৌষ মাসের শেষ চারদিন চাঁউড়ি, বাঁউড়ি, মকর এবং আখান নামে পরিচিত।

চাঁউড়ির দিনে গৃহস্থ বাড়ির

মেয়েরা উঠোন গোবরমাটি দিয়ে নিকিয়ে পরিস্কার করে চালের গুঁড়ো তৈরী করা হয়। বাঁউড়ির দিন অর্ধচন্দ্রাকৃতি, ত্রিকোণাকৃতি ও চতুষ্কোণাকৃতির পিঠে তৈরী করে তাতে চাঁছি, তিল, নারকেল বা মিষ্টি পুর দিয়ে ভর্তি করা হয়। স্থানীয় ভাবে এই পিঠে গড়গড়্যা পিঠে বা বাঁকা পিঠে বা উধি পিঠে ও পুর পিঠা নামে পরিচিত। বাঁউড়ির রাত দশটা থেকে টুসুর জাগরণ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। মেয়েরা জাগরণের ঘর পরিষ্কার করে ফুল, মালা ও আলো দিয়ে সাজায়।

পৌষ সংক্রান্তির আগের রাতে মেয়েরা গোবর দিয়ে পৌষ বুড়ি তৈরী করে সন্ধ্যেবেলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে গান করতে করতে সারা রাত পৌষ আগলায়। এই পৌষ আগলানো মানে ফসল আগলানো। খেতে পাকা ফসল, পুরুষেরা রাতে সেখানে পাহারায় ফসল আগলানোতে ব্যস্ত। মেয়েরা তাই গৃহের রক্ষক, একা রাত জাগা যায় না। তাই দলবেঁধে উৎসব।

টুসু ঘরের মেয়ে, ফসল রূপী অাবাদের দেবী।এই আরাধনা কবে থেকে চলে আসছে তার সঠিক তথ্য না পাওয়া গেলেও সম্রাট অশোকের আমলে এই একই ধরনের সমান্তরাল উৎসবের বর্ণনা পাওয়া যায় ধৌলি ও জৌগাডা শিলালিপিতে পাওয়া যায়।

সমগ্র ধলভূম,বরাভূম ও মানভূমগড় জুড়ে একটা প্রচলিত কাহিনী শুনতে পাওয়া যায় কান পাতলেই।কাশীরাজের কন্যা টুসু ও ভাদু ইত্যাদি ইত্যাদি.. কিন্তু গবেষনায় স্পষ্ট হওয়া গেছে যে এই গল্প গল্পই। তার কোন সারবত্তা নেই কুড়মি সংস্কৃতি বা রুচির সাথে।

তাই এই ঘরের শস্যরূপী দেবীর কাছেই যত আবদার, অভিযোগ এবং তার কাছেই আনন্দের প্রকাশ। গানগুলিতে তারই প্রকাশ ঘটে।

"উপরে পাটা নীচে পাটা

তার ভিতরে দারোগা

ও দারোগা পথ ছাড়ে দাও

টুসু যাবেন কলকেতা

টুসু যাবেন কলকেতা

খিদে পেলে খাবেন কি?

আনগো টুসুর নতুন গামছা

জিলিপি ছাঁদা বাঁধে দি।"

রাত পোহালে আসে মকর। এই দিন টুসু ভাসান দিয়ে নতুন জামা কাপড় পড়ে এই সম্প্রদায়ের মানুষ। ঘরে ঘরে তৈরি করা হয় মাস পিঠা বা মাংস পিঠা সহ বিভিন্ন ধরনের পিঠে ।

"টুসু আমার চিন্তামণি

মাটির কথা শোনে,

ঘাম পথে আসে মকর

আমাদের ফাগুনে।"

গানে গানে টুসু নিরঞ্জন। রঙীন সুদৃশ্য চৌড়লে চাপিয়ে টুসুকে ভাসিয়ে দেওয়া হয় বড়ো জলাশয় বা নদীতে। সবেধন নীলমণি কন্যারত্নটিকে জলে ভাসিয়ে দেওয়ার সময়, গ্রাম্য রমণীদের সে কি শোকবিহ্বল চেহারা! অশ্রুসিক্ত বদনে তখন সেই মন খারাপের গান-

"আমার বড়ো মনের বাসনা,

টুসুধনকে জলে দিবো না।"

মকর পরবের অপরিহার্য অঙ্গ টুসু গান। মানুষের চিরন্তন আশা আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয় এইসব টুসু গানে। মানভূমের ভাষা আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গের দিনে মানুষকে সচেতন করার কাজে টুসু গানের এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে।প্রকৃত অর্থেই টুসু কুড়মিদের মহামিলনের পরব।

মোট কথা জঙ্গলমহল জুড়ে চলে সারা বছরের উৎসব বাতাবরণ। এই আনন্দ এই নেগাচার কুড়মিদের রন্ধ্রে রক্তে মজ্জায়। এর কোনও লিপিবদ্ধ নিয়মাবলীও নেই। নেই বাধ্যবাধকতাও। তবুও তারা হৃদয়ের টানে মেতে ওঠে উতসবগুলিতে। এই উৎসব চলে আসছে পুরুষানুক্রমিক।

English summary
Kurmi observes Tusu parab (tribal festival) at the day of makar Sangkranti in Jangal Maha.
চটজলদি খবরের আপডেট পান
Enable
x
Notification Settings X
Time Settings
Done
Clear Notification X
Do you want to clear all the notifications from your inbox?
Settings X