টোকিও অলিম্পিকে দেশের একমাত্র জিমন্যাস্ট প্রণতিকে নিয়ে উদ্বিগ্ন কোচ মিনারা, শুভেচ্ছা মমতার
টোকিও অলিম্পিকে অংশ নিতে ১৭ জুলাই ভারত থেকে প্রথম যে প্রতিযোগী, কোচ ও সাপোর্ট স্টাফরা রওনা দেবেন তাঁদের মধ্যে থাকছেন বাংলার প্রণতি নায়েক। দেশের একমাত্র জিমন্যাস্ট। রাজ্য সরকারের তরফে খেল সম্মান পুরস্কার পাওয়া প্রণতিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও স্বপ্নপূরণের আগে ছাত্রীকে নিয়ে উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন কোচ মিনারা বেগম।

মিনারার আক্ষেপ
৮ বছর বয়সে কলকাতা সাইয়ে প্রণতি নায়েককে ছাত্রী হিসেবে পান মিনারা বেগম। প্রথমে তিনি ছিলেন চণ্ডীগড় সাইতে। সেখানেও ভারতীয় দলের জিমন্যাস্টদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। পরে কলকাতা সাইয়ে কোচ ছিলেন। চণ্ডীগড়ে যেমন কোচিংয়ের জন্য সম্মানিত হয়েছেন, তেমনই বাংলাতে রাজ্য সরকারের ক্রীড়াগুরু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। ৩৫ বছরের কোচিং কেরিয়ার। তাঁর প্রশিক্ষণ পেয়ে অনেকেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্য পেয়েছেন। কিন্তু এই প্রথম তিনি থাকতে পারবেন না প্রণতির সঙ্গে। মিনারার কথায়, প্রণতির বয়স ২৬। সেখানে কোচ হিসেবে মধ্যপ্রদেশের লক্ষ্মণ শর্মা যাচ্ছেন, যাঁর বয়স ২৭। জেলাস্তরেই কোনও জিমন্যাস্ট তৈরি করেননি। ১৮ বছর ধরে প্রণতিকে নিয়ে স্বপ্ন তাড়া করেছি। আমি জাতীয় পর্যায় অবধি সাফল্যে পেলেও প্রণতিকে ছোটবেলা থেকে অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার লক্ষ্যে তৈরি করেছি। অথচ সেই স্বপ্নপূরণের শেষ মুহূর্তেই থাকতে পারছি না।

বঞ্চনার অভিযোগ
মিনারা বেগম জানালেন, বারবার বঞ্চনার শিকার হয়েছি, তবে প্রতিবারই ছাত্রীদের কথা ভেবে কিছু বলিনি। কিন্তু এবার অলিম্পিকেরটা মানতেই পারছি না। আগেও এমন হয়েছে ভারত থেকে দুজনের মধ্যে আমার একজন বা চারজনের মধ্যে দুইজন ছাত্রী এশিয়ান গেমস বা কমনওয়েলথ গেমসে অংশ নিয়েছেন। অথচ কখনও এক মাসের জন্য কোরিওগ্রাফার এনে আমাকে বাদ দিয়ে তাঁকে পাঠানো হয়েছে। সাইতে অনেকেই আছেন অবসরের পরও কোচিং করাচ্ছেন। আমি ২০১৯ সালে অবসর নিয়েছি, তারপরও ওই বছরই যখন এশিয়ান আর্টিস্টিক জিমন্যাস্টিক্সে প্রণতি ব্রোঞ্জ জিতলেন তখনও ওঁর সঙ্গে ছিলাম। লকডাউনেও প্রণতির প্রশিক্ষণে যাতে খামতি না থাকে সেজন্য পাশে থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু রাজনীতি করে আমাকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে। হয়তো সংখ্যালঘু বাঙালি মহিলা বলেই বারবারই আমাকে বঞ্চনার শিকার হতে হচ্ছে।

প্রণতির জন্য চিন্তা
১৮ বছর ধরে প্রণতি নায়েককে অনুশীলন করানো মিনারা বেগম বলছিলেন, লক্ষ্মণ শর্মা অনলাইনে প্রণতিকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন বলে তাঁকে অলিম্পিকে পাঠানোর কথা বলা হচ্ছে। অথচ প্রণতির কী হলে ভালো আমার চেয়ে ভালো কেউ জানে না। অনলাইনে জিমন্যাস্টিক্সের প্রশিক্ষণ হয়! সাই বন্ধ থাকাকালীনও বিশেষ ব্যবস্থা করে কয়েকজনকে কোচিং করানো হচ্ছে। আমি সাইয়ের ডিরেক্টর জেনারেল থেকে শুরু করে আইওএ সকলকেই জানিয়েছি। চেয়েছিলাম প্রণতিকে অনুশীলন করাতে। কিন্তু সে সুযোগ পেলাম না! প্রণতির ফোনও এখন নাকি লক্ষ্মণ শর্মা নিয়ে রেখেছেন। আমাকেও কথা বলতে দেওয়া হয় না প্রণতির সঙ্গে। আমার ছাত্রীরাও ফোন করে প্রণতির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না। আমাকে ছেঁটে ফেলে লক্ষ্মণকে যখন অলিম্পিকে পাঠানো হচ্ছে তখন প্রণতি কিছু বলতে পারেননি, কিন্তু আমি বুঝেছি কতটা রাজনীতি, কতটা চাপের মুখে পড়ে এই অবস্থায় ওঁকে থাকতে হয়েছে। তবে আমিও চাই না, এই অবস্থার মধ্য়ে প্রণতির অলিম্পিকের মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটুক।

আশায় মিনারা
২০১৯ সালের অক্টোবরে জার্মানিতে প্রণতির সঙ্গে শেষবার গিয়েছিলেন মিনারা বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের সময়। এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ বাতিল হওয়ায় কন্টিনেন্টাল কোটায় অলিম্পিকের ছাড়পত্র পেয়েছেন প্রণতি। সেটা সম্ভব হয়েছে ওই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে পারফরম্যান্সের সুবাদেই। তবে লকডাউনে প্রণতির প্রস্তুতিতেও ব্যাঘাত ঘটে। ফিটনেস কমে গিয়েছিল। মাস দুয়েকের ট্রেনিং নিয়েছেন। অলিম্পিয়ান দীপা কর্মকার তাঁকে ফোন করে পরামর্শ দিয়েছেন, মিউজিকের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে। যে সমস্যা রিওতে ভুগিয়েছিল দীপাকে। মিনারা বলছিলেন, বিমে বরাবরই ভালো প্রণতি। তবে অলিম্পিকের আগে ওঁকে কী ধরনের প্রস্তুতি করানো হচ্ছে তা সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। আমি একরকমভাবে প্রণতিকে ছোটবেলা থেকে তৈরি করেছি। চাইব নিশ্চিতভাবেই অলিম্পিক থেকে পদক আনুক। কিন্তু শেষ প্রস্তুতি নিয়ে আমার চিন্তা থাকছেই।

প্রণতির অস্ত্র
মহিলাদের অল-অ্যারাউন্ডে নামবেন প্রণতি। দীপা কর্মকারের বিশেষত্ব যেমন প্রোদুনোভা ভল্ট, তেমন প্রণতি ফ্রন্ট ও ব্যাকে ৩৬০ ডিগ্রি ভল্টে পারদর্শী। অনুশীলনে যাতে চোট না লাগে সে ব্যাপারেও প্রণতিকে পরামর্শ দিয়েছেন দীপী কর্মকার। মিনারা বেগম বলছিলেন, আট বছর বয়সে যখন প্রণতিকে দেখি তখন ওঁকে বলেছিলাম কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলতে, আমি অলিম্পিকে নামার লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছি। অলিম্পিক কী সেটা তখন বোঝার বয়স ওঁর ছিল না। পরে বুঝতে পারেন। অলিম্পিকের যোগ্যতা অর্জন কতটা কঠিন কেরিয়ার এগোতেই তা বুঝতে পারেন প্রণতি। এবারের অলিম্পিকে দেশের একমাত্র জিমন্যাস্ট হিসেবে তিনি টোকিওর পথে। দীপার পর দ্বিতীয় জিমন্যাস্ট যিনি অলিম্পিকে নামবেন। দীপা, অরুণা রেড্ডি-র পর প্রণতিরও রয়েছে আন্তর্জাতিক পদক।

কঠিন লড়াই
প্রণতিদের আদি বাড়ি ঝাড়গ্রামে। বাবা শ্রীমন্ত নায়েক বেসরকারি বাস চালাতেন। তিন বোনের মধ্যে প্রণতি মেজো। বাবা বাড়ি থাকার বেশি সুযোগ পেতেন না বলে প্রণতিদের রেখেছিলেন পিংলায় মাসির বাড়িতে। আর্থিক প্রতিবন্ধকতায় অনুশীলনের পাশাপাশি মুড়ি খেয়ে কাটাতে হতো, যা বাড়িয়ে দেয় প্রণতির জেদ। পিংলার স্থানীয় স্কুলে শুভাশিস চক্রবর্তীর কাছে জিমন্যাস্টিক্স শুরু, তখন ভাবতেন যোগাসন করছেন। জেলাস্তরে সাফল্যের পর ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক সাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন সেখানে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করানোর জন্য। সাই থেকে বলা হয় নিয়ে আসতে। কিন্তু কলকাতা সাইয়ে অনেকের মধ্যে আলাদা করে প্রণতিকে চিনতে না পেরে কোচেরা বলে দেন, এখন জিমন্যাস্টিক্সে ভর্তি নেওয়া হবে না। প্রত্যাখ্যাত হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাবার হাত ধরে প্রণতিকে ফিরে আসতে দেখে সাইয়ের এক কর্মী ডিরেক্টরের কাছে নিয়ে যান। তিনিই প্রণতিকে পাঠান মিনারা বেগমের কাছে।

দৃঢ়চেতা প্রণতি
প্রথমেই হস্টেল মেলেনি। আর্থিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও বাড়ি ভাড়া নিতে হয়েছিল। যুবভারতীর কাছে পরিচিতর বাড়িতে প্রণতিকে রাখার বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। মা ও বাবা এক সপ্তাহ অন্তর ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আসতেন। অথচ ওই বাড়িতেই প্রণতিকে বাসন মাজা, ঘর মোছার কাজ করতে হতো। পরে তা জানতে পেরে প্রণতিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মাম প্রতিমা নায়েক। সেই সময় মিনারা বেগম প্রণতির বাবা-মাকে বলেন, প্রণতি আমার বাড়িতে থাকবে। মিনারা বেগমের বাড়িতে বছরখানেক থাকার মধ্যেই জাতীয় মিটে সোনা জেতেন প্রণতি। মেলে হস্টেল। জিমন্যাস্টিক্সের সুবাদেই চাকরি পেয়েছেন। জমি কিনে গড়েছেন নিজেদের বাড়ি। বাকিটা শুধুই উত্তরণ। অনুশীলনে শুকনো মুড়ি খেয়ে অদম্য মনোভাব নিয়ে এগিয়ে চলা প্রণতির পরের স্টেশন অলিম্পিক। পদক জয় কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়।
(ছবি- প্রণতি নায়েকের ইনস্টাগ্রাম ও মিনারা বেগমের ফেসবুক)
Heartiest congratulations to our very own Pranati Nayak, who is the only gymnast representing India at #Olympics2021!
— Mamata Banerjee (@MamataOfficial) July 13, 2021
Pranati hails from a small town in Medinipur. Owing to her hard work, she has already won many accolades and I am confident of her success this time as well!
-
ভবানীপুর ও নন্দীগ্রামে উত্তাপ চরমে, শুভেন্দুর বিরুদ্ধে ভয়ের রাজনীতির অভিযোগে মনোনয়ন বাতিলের দাবি তৃণমূলের -
যুদ্ধ নয়, আলোচনায় সমাধান! হরমুজ ইস্যুতে বৈঠক ডাকল ব্রিটেন, যোগ দিচ্ছে ভারত -
'মালদহ কাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড' মোফাক্কেরুল ইসলাম গ্রেফতার, পালানোর সময় বাগডোগরা থেকে ধৃত -
আরও একটি সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকা প্রকাশ করল নির্বাচন কমিশন, আর কত নাম নিষ্পত্তি হওয়া বাকি? -
বাংলায় ভোট পরবর্তী হিংসা রুখতে অনির্দিষ্টকালের জন্য থাকবে কেন্দ্রীয় বাহিনী -
ভোটের আগেই কমিশনের কড়া নির্দেশ! অনুমতি ছাড়া জমায়েত নয়, নিয়ম ভাঙলেই গ্রেফতার, রাজ্যজুড়ে জারি কঠোর নির্দেশ -
দাগি নেতাদের নিরাপত্তা কাটছাঁট কতটা মানল পুলিশ? স্টেটাস রিপোর্ট চাইল নির্বাচন কমিশন -
যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝেই বড় রদবদল! মার্কিন সেনা প্রধানকে সরাল ট্রাম্প প্রশাসন, কারণ কী, জল্পনা তুঙ্গে -
আরও একটি মার্কিন F-35 যুদ্ধবিমান ধ্বংসের দাবি ইরানের, কী বলছে আমেরিকা? -
এপ্রিলে শক্তিশালী ত্রিগ্রহী যোগ, শনি-সূর্য-মঙ্গলের বিরল মিলনে কাদের থাকতে হবে সতর্ক? -
এপ্রিলেই বাড়ছে গরমের দাপট! আগামী সপ্তাহেই ৪-৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়ার আশঙ্কা, কী জানাচ্ছে হাওয়া অফিস -
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের প্রভাব! শিল্পে ধাক্কা, একলাফে বাড়ল ডিজেলের দাম, কত হল? জানুন












Click it and Unblock the Notifications