কাটতে হত তিন টাকার টিকিট, তবেই দেখা যেত শোভাবাজার রাজবাড়ির উৎসব
এক সময় পুরাতন কলকাতা তথা গ্রাম বাংলা অথবা বৃহত্তর পরিসরে ভারতের অন্যান্য অনেক জায়গায় দুর্গা পুজো ছিল নিতান্তই বাড়ির পুজো। তাতে সাবেকিয়ানা, বিভিন্ন রীতি-রেওয়াজ ইত্যাদির সূত্রে পুজোর আমেজ হয়ে উঠত অনন্য। আন্তরিকতা থাকত অনেক বেশি। তুলনায় আপাত চটুল এবং উগ্র আধুনিকতার রেশ মাত্র থাকত না। কালক্রমে কলকাতার কিছু বাড়িতে দুর্গা পুজো এখনও চলছে, প্রচারমাধ্যমের অনুগ্রহে যা এখন বনেদি বাড়ির পুজো বলে পরিচিত। অন্যতম শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো যা এই বছরে ২৬৬ বছরে পা দিল।
বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা, ১৭৫৭ সালের ২৩ জুনে পলাশীর যুদ্ধে হেরেছিলেন৷ সেই যুদ্ধে ব্রিটিশদের যারা সহায়তা করেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রাজা নবকৃষ্ণ দেব৷ শোনা যায় সেই সময় ক্লাইভ চিন্তিত ছিলেন দেশীয় প্রজাদের নিয়ে৷ মীরজাফরকে বাংলার নবাব করে মুসলিমদের কিছুটা আস্থাভাজন হতে পারলেও হিন্দুদের নিয়ে ছিলেন উদ্বিগ্ন৷ সেই সময় নবকৃষ্ণের কাছ থেকে দুর্গাপুজোর আমন্ত্রণ আসলে তিনি তা সাদরে গ্রহণ করেন৷ কারণ তখন ক্লাইভ মনে করেছিলেন বঙ্গের হিন্দুদের প্রধান উৎসব দুর্গাপুজোয় সশরীরে হাজির হলে হিন্দুদের আস্থা অর্জন সম্ভব হবে৷ অর্থাৎ এই পুজোর আয়োজনে ক্লাইভ এবং নবকৃষ্ণ উভয়ের উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছিল বলেই মনে করা হয়৷ ক্লাইভকে আমন্ত্রণের ফল স্বরূপ জমিদার নবকৃষ্ণ রাজা উপাধি পেলেন৷ তাছাড়া জুটল সিরাজের কোষাগারের লুন্ঠিত সম্পত্তির একাংশ৷

সিরাজের পরাজয়ের আনন্দে
সিরাজের পরাজয়ের মধ্যে রাজা নবকৃষ্ণ নিজের জয় খুঁজে পেয়েছিলেন আর সেই আনন্দে সে বছর নিজের বাড়িতে দুর্গাপুজো শুরু করেন৷ সে বছর পুজোর অন্যতম অতিথি ছিলেন লর্ড ক্লাইভ। নবকৃষ্ণ কোন এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে পাঠানো পুজোর আমন্ত্রণ পত্রে লিখেছিলেন -এবার পুজার সময় লর্ড ক্লাইভ আমার বাটিতে অনুগ্রহপূর্বক প্রতিমা দর্শন করিতে আসিবেন। তাঁহার সহিত কোম্পানির বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত থাকিবেন। তোমার আসা চাই।

রাজবাড়ির জাঁকজমক
সেবারে রাজবাড়িতে উৎসবের নিমিত্তে খরচা এবং জাঁকজমকে একেবারে তাক লাগিয়ে দিলেন নবকৃষ্ণ৷ দেবীর বসার জন্যে এক বিরাট সোনার সিংহাসন নির্মিত হয়েছিল৷ যাকে ঘিরে ছিল সোনা-রূপার কাজ৷ ওই যে শুরু হল তারপর প্রতি বছর সাহেব-মেমরা আমন্ত্রিত হতেন পুজোয়৷ আর তাদের জন্য এমন আপ্যায়নের ব্যবস্থা হত তা কল্পনার অতীত৷ অতিথির মনোরঞ্জনের জন্য বসত বাইজি নাচের আসর৷ পাশপাশি বসত নাচগান আর যাত্রাপালার আসর৷ থাকত ইংরেজদের প্রিয় বল ড্যান্সও৷
পুজোয় বাঈ নাচ শুরু হয়েছিল শোভাবাজার রাজবাড়ি থেকে। পনেরো দিন ধরে নাচ চলত। বাইরে থেকে যে কেউ এসে বাঈ নাচ দেখে যেতে পারত তবে একটা শর্ত ছিল। আমন্ত্রণ পত্র ছাড়া বাড়িতে ঢোকার উপায় ছিল না। রাজবাড়ির পুজোর এই আমন্ত্রণ পত্রকে সেকালে অনেকে টিকিট বলতেন। রসরাজ জানিয়েছেন
-পুজোর তিন দিন টিকিট না দেখালে ঢোকবার জো নেই, আর রাজার বাড়ির একখানি টিকিট পাবার জন্য কত হাঁটাহাঁটি, কত সাধ্যসাধনা। অনেক বড় বড় সাহেবও রাজার বাড়িতে সস্ত্রীক নিমন্ত্রণ পত্র পাবার জন্য পরিচিত অন্য সাহেব বা বিশ্বস্ত বাবুদের সুপারিশ ধরতেন।

জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁর বাড়ি
সেকালের কলকাতায় একটি কথা প্রচলিত ছিল - মা এসে গয়না পরেন জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁর বাড়ি, ভোজন করেন কুমারটুলির অভয়চরণ মিত্রের বাড়ি আর রাত জেগে নাচ দেখেন শোভাবাজার রাজবাড়িতে। রাজবাড়ির দেখাদেখি কলকাতার আরও অনেক বনেদি বাড়িতে দুর্গা পুজোয় নাচের অনুষ্ঠানের আয়োজন হত।

বিস্ময়কর বিলাসিতা
বিস্ময়কর বিলাসিতা দেখিয়েছিলেন পাথুরিয়াঘাটার খেলাত ঘোষ। নাচের ঘরের মেঝে জুড়ে থাকত সুদৃশ্য ফরাসি গালিচা, রাজকীয় পরিবেশে ক্লিওপেট্রা কোচে বসতেন অতিথি-অভ্যাগতরা। মাথার ওপরে কড়িকাঠে ঝুলত দামি ঝাড়বাতি।












Click it and Unblock the Notifications