হ্যাপি বিজয়ার যুগে চাপা পড়েছে বিজয়ার প্রণাম, কেমন ছিল সে যুগের বিজয়া? জেনে নিন
এখন তো হ্যাপি বিজয়ার যুগ। পাঁচের দশকের বিজয়া কেমন ছিল, তা সম্বন্ধে কথা বললেন স্বপন গোস্বামী। তিনি বলেছেন, পাঁচের দশকের গ্রামবাংলার আটচালায় জগজ্জননী মা দুর্গার আরাধনার আজ শেষ দিন। এই মাতৃ আরাধনায় কোন আড়ম্বর নেই আছে আন্তরিকতা।
সে যুগে মা দুর্গাকে নিয়ে সেরার সেরা হবার উদগ্র বাসনা ছিল না । তখন সে কালে মাটির প্রতিমাকে নিয়ে ক্লাবের কর্মকর্তাদের ঢক্কানিনাদে বাহুল্যের বাগাড়ম্বর পরতে পরতে সাজিয়ে পুজো পুজো খেলায় মেতে ওঠার ফ্যাশন ছিল না।

মাটির প্রতিমা
তিনি বলেছেন, "এই সেরার সেরা দের অনুমান করেই বহুকাল আগেই কবির কলমে ধিক্কার ঝরে পড়েছিলঃ " মাটির প্রতিমা পুজিস গো তোরা, মাকে তো তোরা পুজিস না "। তখনকার সমাজের প্রার্থনা " হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি বাহুতে তুমি মা শক্তি , তোমারি প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে ।" আটচালার মন্ডপ ছেড়ে সেই মা চলে যাবেন কৈলাসে , মর্ত বাসীকে বিষণ্ণতার চাদরে মুড়ে দিয়ে । আমাদের সকলের মন সত্যিই খারাপ হত। আমাদের মত শিশুদের চোখে পড়ত মা কাঁদছেন।
তার কথায়, বিসর্জনের ঠাকুরের শোভাযাত্রার সঙ্গে গ্রাম ঘোরার অনুমতি আমরা পেতাম না । হিম পড়ছে । ঠাণ্ডা লাগবে। নামেই শোভাযাত্রা । ঠাকুরের সামনে ও পিছনে বিশেষ কাঠের ফ্রেমে বেঁধে ঝোলানো ডেলাইট মাথায় নিয়ে দুজন যেত। সেই আলোয় যতটা পথ আলোকিত হত তাতেই গ্রামের আবাল বৃদ্ধ সঙ্গে সঙ্গে যেত ।না ! কোন বনিতা বিসর্জন দেখার অনুমতি পেত না।
সিদ্ধি খেয়ে চুড় হয়ে বাগদি পাড়ার সবাই এসে ঠাকুরকে মণ্ডপ থেকে বাইরে এনে তিনটে বাঁশের ওপরে বসিয়ে ভালো করে বাঁধত। তার আগে গাঁয়ের এয়োস্ত্রীরা মা দুর্গাকে বরণ করত। তখন আমাদের মাকে প্রণামের ধুম পড়ত। না ! সিঁদুর খেলা জাতীয় শব্দটা তখন সেই পাঁচের দশকে শুনিনি । এসবের চল ছিল না । ঐ শব্দটা কলকাতায় এসে শুনলাম - আবির খেলার মিনি সংস্করণ।
তারপরে ঠাকুরকে কাঁধে তুলে নিয়ে শুরু হত গ্রাম পরিক্রমা । চারদিন ধরে এতবার দেখা দুর্গা মাকে শেষ বারের মত দেখার জন্যে রাস্তার মোড়ে মোড়ে মা কাকি বৌদিরা হ্যারিকেন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন মাকে শেষ নমষ্কার জানানোর জন্য ।

সিদ্ধির নেশা
মাতব্বরদের বাড়ির সামনে বাহকরা ঠাকুর নামাত। সিদ্ধির নেশায় সেখানে তারা নাচতে শুরু করত ,যতক্ষণ পর্যন্ত না গৃহকর্তা এসে তাদের হাতে পাঁচ দশ টাকা বিজয়ার বকশিষ হিসেবে দিতেন ।
এভাবে ঘুরে ঘুরে ঝিমকি নদির ধারে মা দুর্গার বিসর্জন হত । ঠাকুর জলে পড়ার আগে সকলে নদির জলে হাত ডুবিয়ে বসত। ঠাকুর জলে পড়লে সেই জল মাথায় দিয়ে নদি থেকে উঠে আসতাম । তার আগেই জলে নামা লোকজন জল ছুঁড়তে শুরু করত আমাদের ভিজিয়ে দেবার জন্য । এভাবেই বিসর্জন পর্ব সমাপন হত আনন্দে দুঃখে বিষাদে।

গ্রাম ঘুরিয়ে নদীতে বিসর্জন
হ্যাজাক ডেলাইটের আলোয় বিজয়া দশমীর রাতে দুর্গা ঠাকুরকে গ্রাম ঘুরিয়ে নদীতে বিসর্জন করে বারোয়ারীতলায় ফিরে শান্তিজল নিয়ে ঠাকুর তলাতেই উপস্থিত সকলের সঙ্গে কোলাকুলি করে বিজয়ার সূচনা হত । পরদিন সকালে মায়ের কথামত ঘরের দেয়ালে টাঙান যত রাজ্যের ক্যালেন্ডারের ছবি কেটে বাঁধানো ঠাকুর দেবতার ছবি ও দাদুর ফটোতে প্রণাম করে পাড়ায় বেরতাম বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিজয়ার প্রণাম করতে । পাড়ার কাকিমা জেঠিমা ঠাকুমারা চিবুক ধরে চুমো খেয়ে ভাল থাকার আশীর্বাদ করতেন । নাড়ু দিতেন । অনেক নাড়ু সংগ্রহ হত ।

প্রণাম
বাড়ি ফিরলে মা বলত - বাবাকে প্রণাম করেছিস? উত্তর হত - 'না ' । তখন বাবাকে প্রণাম করতে যত রাজ্যের লজ্জা, সংকোচ আড়ষ্টতা ভিড় করত ।পাশের গ্রাম থেকে আদিবাসী লোকজন আসত বামুন বাড়িতে বিজয়া করে লুচি কুমড়োর ছক্কা মিষ্টি প্রসাদ পেতে । গ্রামের দিকে বিজয়া উপলক্ষে ঘুগনি নিমকি দেওয়ার চল ছিল না ।

চিঠি লেখার পর্ব
এবার বিজয়ার চিঠি লেখার পর্ব । ওপরে শ্রী শ্রী দুর্গা মাতা সহায় ,ডান দিকে বিজয়া দশমী লিখে বাঁধা গতে শ্রীচরণেষু সম্বোধনে চিঠি শুরু করা হত - আপনি আমার ও আমাদের বাড়ির সকলের বিজয়ার প্রণাম গ্রহন করিবেন ,অন্যান্য গুরুজনদের আমাদের বিজয়ার প্রণাম জানাইবেন ।
খুঁত ধরতে ওস্তাদ গুরুজনদের নাম আলাদা করে উল্লেখ করে লিখতে হত - সেজ মাসীকে আমাদের বিজয়ার প্রণাম জানাইবেন । ছোটদের স্নেহাশিস দিবেন ।
পোস্ট কার্ডের পিছনের আধখানায় ছোটরা ঐ একই গতে বিজয়ার চিঠি লিখত । চিঠি যাতে তাড়াতাড়ি পৌঁছও সেজন্য গ্রামের বর্ষীয়ান ডেলি প্যাসেঞ্জার এর হাতে চিঠি গুলি দেওয়া হত হাওড়া ষ্টেশনের বড় ঘড়ির নিচের লেটার বক্সে পোস্ট করার জন্য । বিজয়ার চিঠিতে ঐ লেটার বক্স ভর্তি হয়ে উপছে পড়ত ।এখন হ্যাপি বিজয়ার যুগ । পাড়া প্রতিবেশীর বাড়ি যাওয়া নিয়ে ইগোর লড়াই । ও কি আমাদের লোক না ওদের দলের ? সেই বুঝে বিজয়া হবে। ওর বাড়িতে বিজয়া করার পরিবর্তে ভেট নিয়ে নেতার বাড়িতে প্রণাম করতে যাবার অনেক প্লাস পয়েন্ট , এটাই বর্তমানের সোশ্যাল স্টাইল ।












Click it and Unblock the Notifications