• search
For Quick Alerts
ALLOW NOTIFICATIONS  
For Daily Alerts

কলকাতায় কেন এত ‘বিপজ্জনক বাড়ি’

  • By Bbc Bengali
কলকাতার বিপজ্জনক বাড়ি
BBC
কলকাতার বিপজ্জনক বাড়ি

কলকাতার বহু পুরনো একটি বাড়ি ভেঙ্গে পড়ে দিন তিনেক আগেই আহত হয়েছেন কয়েকজন।

চলতি বছরেই বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষ সেই শহরে মারাও গেছেন পুরনো বাড়ি ভেঙ্গে গিয়ে।

কিন্তু এখনও এরকম প্রায় আড়াই হাজার বাড়ি রয়েছে, যেগুলি বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত - যার মধ্যে ১০০ টি বাড়ি অতি বিপজ্জনক।

সেখানে বসবাস করারই কথা নয়, তবুও জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বহু মানুষ সেখানে থাকছেন দশকের পর দশক।

যেমন মধ্য কলকাতার মৌলালীর সদা ব্যস্ত লেনিন সরণীর ওপরেই রয়েছে অতি প্রাচীন বাড়ি।

ইঁট বেরিয়ে পড়েছে, চারদিক থেকে ঝুলছে বট আর অশ্বত্থ গাছের ঝুড়ি।

ভর দুপুরেও ঘুটঘুটে অন্ধকার এক সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় ওপরে।

কয়েকটা আধো অন্ধকার জায়গা পেরোনোর সময়ে ভাঙ্গা ছাদের ফাঁক দিয়ে এক টুকরো আকাশ চোখে পড়ে।

যুবক অ্যান্ড্রু মন্ডলের পরিবার চার পুরুষ ধরে এই বাড়িরই কয়েকটা ঘরে ভাড়া থাকেন।

"বাড়িটা ১৮৪৮ সালে তৈরী। প্রায় একশো সত্তর বছর। শুধু আমি কেন, আমার বাবারও জন্ম এখানেই। ২০০৮ সালে এই বাড়িটাতে কর্পোরেশন বিপজ্জনক বাড়ির নোটিশ লাগিয়ে দেয়," বলছিলেন ওই যুবক।

অ্যান্ড্রুর বাবা অনুতোষ মন্ডলের বয়স প্রায় সত্তর বছর। গোটা জীবন এই বাড়িতেই কেটেছে তাঁর। জানতে চেয়েছিলাম এরকম ভগ্নদশা কবে থেকে হল বাড়িটার?

সিনিয়র মি. মন্ডলের কথায়, "এরকম অবস্থাতো আগে ছিল না। গমগম করত বাড়িটা। সব ঘরেই ভাড়াটিয়া থাকত, পেছনের দিকে জমিতেও অনেকে থাকত। মালিক যেমন রক্ষণাবেক্ষণ করতেন, আমরাও নিজেদের ঘরগুলো মেরামত করে নিতাম।

কিন্তু উনি মারা যাওয়ার পরে উনার ছেলে জানায় যে নিজের ডাক্তারি পেশার মধ্যে এই বাড়ি দেখভাল তার পক্ষে সম্ভব নয়। সে আমাদের মত নিয়েই বাড়িটা এক প্রোমোটারকে বিক্রি করে দিয়েছিল।"

মি. মন্ডলদের পরিবার দাবী করছিল যে তাঁদের এই ভগ্নপ্রায় ভাড়া বাড়িটি নিয়ে মামলা চললেও নিজেরা যে ঘরগুলিতে থাকেন সেগুলোকে নিয়মিত সারাই, রঙ করান তাঁরা। তাই তাঁদের এরকম একটা বিপজ্জনক বাড়িতে থাকতে খুব একটা ভয় করে না, তাঁদের অভ্যেস হয়ে গেছে।

ভেঙে পড়া বাড়ির একাংশ
BBC
ভেঙে পড়া বাড়ির একাংশ

নিজেদের প্রায় একশো বছরের পুরনো বাড়িটি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করতো মধ্য কলকাতারই ইন্ডিয়ান মিরর স্ট্রিটে তিন পুরুষের বাসিন্দা সাউ পরিবারও।

তা স্বত্ত্বেও সাউ পরিবারের বাড়িটি কিছুদিন আগে হঠাৎই ভেঙ্গে পড়ে। ধ্বংসস্তুপে চাপা পড়ে মারা যায় পরিবারের একটি মেয়ে আর পাশের একটি দপ্তরের এক কর্মী।

ধ্বংসস্তুপের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম সাউ পরিবারেরই এক আত্মীয় পবনলাল সাউয়ের সঙ্গে - যিনি একেবারে গায়ে লাগা বাড়িতেই থাকেন।

মি. সাউ জানান তাঁর দাদু এই বাড়িটা কিনেছিলেন।

"আমার কাকার ছেলেরা থাকত এই ভেঙ্গে পড়া বাড়িতে। আমি পাশের বাড়িতে থাকি। আমার ওই ভাইরা কিন্তু বাড়িটার খুব যত্ন করতো। নিয়মিত মেরামত হতো, রঙ হতো, কাঠের বিম সারানো হতো। ভেঙ্গে যাওয়ার পরেও দেখুন ভেতরের অবস্থাটা কতো ভালো।"

"এর থেকে অনেক খারাপ অবস্থার বাড়ি আছে আমাদের পাড়ায়, সেগুলো ভাঙ্গলো না, এটা ভেঙ্গে পড়লো হঠাৎ। আমার এক ভাইঝি আর এই পাশের অফিসের একজন স্টাফ চাপা পড়ে গেল। ভেঙ্গে পড়ার কদিন পরে আজই ভাইঝির মোবাইলটা পেয়েছি ধ্সংসস্তুপের সরাতে গিয়ে..."

শেষের দিকের কথাগুলো বলার সময়ে গলা বুঁজে আসছিল মি. সাউয়ের।

মন্ডল পরিবারের বাড়িটি প্রায় নয় বছর আগে বিপজ্জনক বাড়ি বলে চিহ্নিত করেছিল কর্পোরেশন।

কিন্তু সাউ পরিবারের বাসভবনে বিপজ্জনক বাড়ির বোর্ড বসেছে ওই মর্মান্তিক দুঘর্টনার পরে।

ভেঙ্গে পড়া বাড়ির সামনে পরিবারের এক আত্মীয় পবনলাল সাউ
BBC
ভেঙ্গে পড়া বাড়ির সামনে পরিবারের এক আত্মীয় পবনলাল সাউ

কলকাতা কর্পোরেশনের বিল্ডিং বিভাগের মহাপরিচালক দেবাশীষ চক্রবর্তীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, আগে থেকে কি সাবধান করা যেত না ওই ভবনের বাসিন্দাদের?

"এটা ঠিকই কোনো বাড়ি হয়তো বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত হয়নি। গোটা বাড়িটা হয়তো ভালোই আছে। কিন্তু ঝুল বারান্দা বা কোনও অংশে হয়তো নজর পড়েনি মালিকদের।

নীচের দিকে কোনো থাম বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়তো ভেতরে ভেতরে দুর্বল হয়ে পড়েছে"- বলছিলেন মি. চক্রবর্তী।

মি. চক্রবর্তীই বলছিলেন ওই বাড়িটি যদিও বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত হয়নি, কিন্তু এরকম প্রায় আড়াই হাজার বিপজ্জনক বাড়ি রয়েছে গোটা শহরে, যার মধ্যে ১০০টি বসবাসের পক্ষে অতি বিপজ্জনক। তবুও সেরকম অনেক বাড়িতেই মানুষ বসবাস করেন জীবনের ঝুঁকি নিয়েই।

তাঁর কথায়, "বেশীরভাগ পুরনো আর বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত হওয়া বাড়ির একটা সাধারণ সমস্যা হলো শরিকি বিবাদ। মালিকদের মধ্যেই মামলা মোকদ্দমা - কারও মধ্যে সমন্বয় নেই। কে বাড়ি সারাবে, তার ঠিক নেই। ধীরে ধীরে বাড়িগুলো আরও খারাপ হয়ে যায়।"

ভারতের অন্যান্য বড় শহরেও বহু বাড়ি বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত হয়, সেই সব শহরেও পুরনো বাড়ি ভেঙ্গে পড়ে দুর্ঘটনা ঘরে।

কিন্তু কলকাতা শহরে এত বেশী সংখ্যায় বাড়ি বিপজ্জনক কেন? জানতে চেয়েছিলাম হেরিটেজ ভবন সংরক্ষণ আর পুনর্নিমাণের কাজে বিশেষজ্ঞ স্থপতি মণীশ চক্রবর্তীর কাছে।

"আমাদের কলকাতায় বহু পুরনো বাসভবন থেকে যাওয়ার একটা বড় কারণ হলো এই শহর বহুদিন অর্থের প্রাচুর্য দেখেনি। ইউরোপের দক্ষিণাঞ্চলেও ঠিক এরকমই চিত্র পাওয়া যায়।

সেখানেও অর্থের প্রাচুর্য নেই, তাই হেরিটেজ ভবন হোক বা সাধারণ পুরনো বাড়ি প্রচুর সংখ্যায় রয়েছে দক্ষিণ ইউরোপে। উন্নত শহরগুলোতে পুরনো ভবন বেশী ধ্বংস হয়েছে - কারণ সেখানে পুঁজির বিনিয়োগ ঘটেছে - নতুন নির্মাণ হয়েছে। যেমন লন্ডনে হয়েছে," বলছিলেন মি. চক্রবর্তী।

প্রায় ১৭০ বছরের পুরনো একটি বাড়ি – ছাদ ভেঙ্গে গিয়ে দেখা যাচ্ছে এক টুকরো আকাশ।
BBC
প্রায় ১৭০ বছরের পুরনো একটি বাড়ি – ছাদ ভেঙ্গে গিয়ে দেখা যাচ্ছে এক টুকরো আকাশ।

শরিকি ঝামেলা, মামলা-মোকদ্দমা - এসবের মধ্যেই রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভগ্নপ্রায় বাড়িগুলো ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে বসবাসের পক্ষে বিপজ্জনক।

আর এরকম অনেক বাড়িই রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার বা নির্মাণ ব্যবসায়ীরা কিছুটা সস্তা দরে কিনে নেন। পরে সেটি ভেঙ্গে ফেলে গড়া হয় ফ্ল্যাটবাড়ি বা বাণিজ্যিক ভবন।

কর্পোরেশনও ভগ্নপ্রায় বাড়ি কিনে ভেঙ্গে ফেলে নতুন নির্মাণের জন্য বেশ কিছু ছাড় আর সুবিধা দেয়।

এরকমই এক ব্যবসায়ী পঙ্কজ শাহ। তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম কেন ঝুঁকি নিয়েও বিপজ্জনক বাড়ি কেনেন তাঁরা?

মি. শাহের কথায়, "কলকাতা শহরে ফাঁকা জমি প্রায় নেই বললেই চলে। তাই আমার মতো রিয়েল এস্টেট ডেভেলপাররা এধরণের পুরণো বাড়িই কিনে নিই। পরে সেটিকে ভেঙ্গে ফেলে নতুন ভবন তৈরী হয়। পুরনো বাড়ি হয়তো সস্তায় কেনা যায়, কিন্তু অনেক সময়েই ভাড়াটিয়াদের নানা দাবী মেটাতে হয়, তাতে খরচও হয় অনেক। আর মামলা মোকদ্দমাও হয় অনেক ক্ষেত্রেই।"

"তার ফলে একদিকে ব্যাঙ্ক থেকে নেওয়া ঋণের সুদও গুনছি, এদিকে নতুন ভবন নির্মাণ করে সেগুলো বিক্রি করে যে মুনাফা করবো, মামলা চলা পর্যন্ত সেটাও বন্ধ! আর এর মধ্যে যদি ওই বিপজ্জনক বাড়ি ভেঙ্গে পড়ে, তাহলেতো পুলিশ ওই জমি-বাড়ির মালিক হিসাবে আমাকেই ধরবে। সেই ঝুঁকিতো আছেই," বলছিলেন নির্মাণ ব্যবসায়ী পঙ্কজ শাহ।

স্থপতি মণীশ চক্রবর্তী জরাজীর্ণ বাড়ির সংরক্ষণ আর পুনর্নিমাণে বিশেষজ্ঞ
BBC
স্থপতি মণীশ চক্রবর্তী জরাজীর্ণ বাড়ির সংরক্ষণ আর পুনর্নিমাণে বিশেষজ্ঞ
বিপজ্জনক বাড়ি বলে চিহ্নিত, তবুও সেখানেই ঝুঁকি নিয়ে থাকেন বহু মানুষ, চলে সংসার।
BBC
বিপজ্জনক বাড়ি বলে চিহ্নিত, তবুও সেখানেই ঝুঁকি নিয়ে থাকেন বহু মানুষ, চলে সংসার।

সাধারণত ঐতিহাসিক ভবন বা বিখ্যাত ব্যক্তিদের আবাসস্থলগুলো হেরিটেজ হিসাবে সংরক্ষণ করা হয়।

কিন্তু যে বাড়িগুলোতে হয়তো কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেনি বা কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তি বাস করেননি- সেগুলোও ভেঙ্গে ফেলা হলে যে শহরের ইতিহাস আর ঐতিহ্য কিছুটা হলেও মুছে যায়, সেটা মেনে নিলেন কর্পোরেশনের বিল্ডিং বিভাগের মহাপরিচালক দেবাশীষ চক্রবর্তী।

স্থপতি মণীশ চক্রবর্তী বলছিলেন একটা শহরের চরিত্রকে ধরে রাখতে হলে নতুন-পুরনো দুটোকেই যে টিকিয়ে রাখতে হবে, তা নানা দেশের ঘটনায় প্রমাণিত। তাই বিপজ্জনক বাড়ি শুধুই ভেঙ্গে না ফেলে এটা ভাবা দরকার নতুন আর পুরনোর সহাবস্থান কীভাবে করা যায়।

কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন বড় রকমের অর্থের। কে যোগাবে এক দেড়শো বছরের পুরনো বাড়ি সংরক্ষণের টাকা?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন অনুদান দেওয়া উচিত সরকার বা তাদের নানা সংস্থারই - কারণ কোনো ব্যবসায়ীকে এ ধরনের কাজে উৎসাহিত করা কঠিন।

তবে কলকাতা কর্পোরেশন বলছে, হেরিটেজ ভবন নয় এমন বেশ কিছু বিপজ্জনক বাড়ি সংস্কার আর সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়েছে।

যদিও তা এখনও হাতে গোনা কয়েকটাই মাত্র - আর সেগুলোর মালিকানাও কোনো না কোনো সরকারি সংস্থারই হাতে - ব্যক্তিগত ভবন এভাবে সংরক্ষণ এখনও দূর অস্তই।

কলকাতার জরাজীর্ণ একটি বাড়ি
BBC
কলকাতার জরাজীর্ণ একটি বাড়ি
lok-sabha-home
BBC
English summary
Why so many dangerous houses in Kolkata

Oneindia - এর ব্রেকিং নিউজের জন্য
সারাদিন ব্যাপী চটজলদি নিউজ আপডেট পান.

Notification Settings X
Time Settings
Done
Clear Notification X
Do you want to clear all the notifications from your inbox?
Settings X

Loksabha Results

PartyLWT
BJP+10344354
CONG+38790
OTH128698

Arunachal Pradesh

PartyLWT
BJP42731
JDU167
OTH3710

Sikkim

PartyLWT
SKM11617
SDF21315
OTH000

Odisha

PartyLWT
BJD10112113
BJP22022
OTH11011

Andhra Pradesh

PartyLWT
YSRCP0150150
TDP02424
OTH011

-