• search
For Quick Alerts
ALLOW NOTIFICATIONS  
For Daily Alerts

একাত্তরের ১৭ই ডিসেম্বর ঢাকায় যেভাবে শেখ হাসিনাসহ মুজিব পরিবারের সদস্যদের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা

  • By BBC News বাংলা

বাংলাদেশের ইতিহাস হয়তো ভিন্ন হতো, যদি না ভারতীয় সেনাবাহিনীর এক মেজর ১৯৭১ সালের ১৭ই ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাদের কব্জা থেকে শেখ মুজিবের পরিবারের সদস্যদের অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে আনতে পারতেন।

মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতিতে সেই সেনা কর্মকর্তা অশোক তারাকে পরে বাংলাদেশ সম্মাননা অর্পণ করেছে। কীভাবে সেদিন বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-সহ অন্যদের তিনি প্রাণে বাঁচিয়েছিলেন, সেই কাহিনিই বিবিসি বাংলার শুভজ্যোতি ঘোষের কাছে বর্ণনা করেছেন ওই প্রবীণ সেনানী - এখানে তা রইল অশোক তারার নিজের বিবরণেই।

''একাত্তরের ১৫/১৬ ডিসেম্বরের রাতে আমরা পাকিস্তানি বাহিনীর কব্জা থেকে ঢাকা বিমানবন্দর দখল করলাম। পরদিন বিকেলেই জেনারেল নিয়াজি সই করলেন আত্মসমর্পণের সেই ঐতিহাসিক দলিলে।

বিকেলের দিকে আমরা বিমানবন্দরের রানওয়েতে বসেই একটু রিল্যাক্স করছিলাম। নিজেদের মধ্যে নানা গল্পগাছা চলছিল।

সেই সময়ই ওয়্যারলেসে মেসেজ এলো, এয়ারপোর্টের নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে হবে, কারণ আগামী কয়েক দিনে সেখানে ভিভিআইপি-দের আনাগোনা অনেক বাড়বে।

তো পরদিন খুব সকাল থেকেই আমি ও আমার সহকর্মী মেজর খান্না মিলে লেগে পড়ি এয়ারপোর্টের নানা দিকে ট্রুপ ডিপ্লয়মেন্ট বা সেনা মোতায়েনের কাজে।

১৭ই ডিসেম্বর তখন সকাল আটটা নাগাদ হবে, এমন সময় মুক্তিবাহিনীর এক কিশোর যোদ্ধা ছুটতে ছুটতে আমাদের দিকে এগিয়ে এলো।

তারপর বাংলা আর ভাঙা ভাঙা হিন্দি মিশিয়ে, হাঁফাতে হাঁফাতে ওই ছেলেটি যা বলল তার মর্মার্থ হল পাকিস্তানি সেনারা এখনও কিন্তু ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের পরিবারকে আটকে রেখেছে।

আর সে আরও শুনেছে, তারা না কি যে কোনও সময় গোটা পরিবারকে নিকেশ করে দিতে পারে।

আমি বা আমার সিও (কমান্ডিং অফিসার) কেউই যে খবরটার গুরুত্ব পুরোপুরি অনুধাবন করতে পেরেছিলাম তা নয়। আমার সিও তবু আমাকে বললেন, "তুমি ওর সঙ্গে এক্ষুনি ধানমন্ডি যাও। গিয়ে দেখো তো ব্যাপারটা কী!"

ছুটলাম ধানমন্ডি

আমি তো সঙ্গে সঙ্গে মাত্র দুজন জওয়ান আর ওই মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে ধানমন্ডির দিকে রওনা দিলাম। আমাদের বাহন ছিল শুধু একটা এক টনের মিলিটারি ভেহিকল। প্রসঙ্গত, শেখ মুজিবের পরিবারকে কিন্তু ধানমন্ডির বিখ্যাত বত্রিশ নম্বরে নয়, যুদ্ধের সময় গৃহবন্দী রাখা হয়েছিল ওই এলাকারই অন্য একটি বাড়িতে।

ধানমন্ডির ওই বাড়িটি থেকে যখন আমরা মাত্র একশো গজ দূরে, তখন এক বিশাল জনতা ঘিরে ধরে আমাদের রাস্তা আটকাল। তারা বলতে লাগল, আর একদম এগোবেন না।

কী ব্যাপার? ওই জনতা তখন জানাল বঙ্গবন্ধুর বাড়ির পাহারায় থাকা পাকিস্তানিরা মারাত্মক 'ট্রিগার-হ্যাপি' আর খুনে মেজাজের, যারাই ওই বাড়ির দিকে এগোচ্ছে তাদের দিকে তারা গুলি চালাচ্ছে!

একটু দূরেই পড়ে ছিল একটা বুলেটবিদ্ধ গাড়ি আর ভেতরে একজন সাংবাদিকের টাটকা লাশ। এলাকার লোকজন দূর থেকে আমাদের সেটা দেখিয়ে বলল, কয়েক মিনিট আগেই ওই বাড়িটির দিকে যেতে গিয়ে তার এই পরিণতি হয়েছে।

এমন কী আর একটু সকালের দিকে পাকিস্তানিরা আরও একটা স্থানীয় পরিবারের দিকেও গুলি চালিয়েছে, জখম হয়েছেন তারাও।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

আত্মসমর্পণের আগে পাকিস্তানী সেনাদের মুহূর্তগুলো

এই ছবি দেখেই কি আত্মসমর্পণ করেছিলেন নিয়াজী?

বাংলাদেশ যুদ্ধ জয়ের কৃতিত্ব নিয়ে পাল্টা-পাল্টি দাবি

সব শুনে টুনে আমি একটু থমকে গেলাম। তারপর দু-তিন মিনিট ভাবলাম আমার এখন কী করা উচিত হবে।

প্রথমেই মনে হল, আমি যদি এখন বাড়তি সেনা চেয়ে পাঠাই আমার সিনিয়ররা হাজারটা প্রশ্ন করবেন। তাদের সব বুঝিয়ে সুঝিয়ে যদি বাড়তি ট্রুপ আনানোর ব্যবস্থাও করতে পারি, তাতে অনেকটা সময় লেগে যাবে।

ততক্ষণে ওই পাকিস্তানি সেনারা যে শেখ মুজিবের পরিবারের সদস্যদের জীবিত রাখবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। ফলে এটা পরিষ্কার ছিল, সময় হাতে খুব কম - এটা ধরে নিয়েই আমাকে যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার তা নিতে হবে।

কিন্তু মাত্র দুজন জওয়ানকে সঙ্গে নিয়ে ধানমন্ডির ওই বাড়িতে অভিযান চালানো চরম নির্বুদ্ধিতা হতো। অতএব ওই সম্ভাবনা প্রথমেই খারিজ।

লড়াইটা ছিল মনস্তাত্ত্বিক

আমি তখন দেখলাম, এই পরিস্থিতিতে 'সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার' বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চালানোই একমাত্র রাস্তা। শেখ মুজিবের পরিবারকে বাঁচাতে হলে সেই মুহূর্তে আমার সামনে আর কোনও পথও ছিল না।

আমি তখন আমার অস্ত্রটা দুই জওয়ানের কাছে জমা রেখেই খালি হাতে বাড়িটার দিকে এগোব বলে মনস্থ করলাম। আর ওদের বলে গেলাম, একদম আমাকে ফলো করবে না।

তারপর আমি ধীরে ধীরে বাড়িটার দিকে এগিয়ে সাংবাদিকের পড়ে থাকা লাশটা পেরোতেই জোরে চিৎকার করলাম, 'কোই হ্যায়?'

কোনও জবাব এল না। আর দু-এক পা এগোতেই আমি সশস্ত্র পাকিস্তানি সেনাদের পরিষ্কার দেখতে পেলাম, আবার একই প্রশ্ন করলাম। তারপরও সব চুপচাপ!

তখন একেবারে শামুকের গতিতে আমি বাড়ির গেটের দিকে এগোচ্ছি। যখন গেট থেকে মাত্র পাঁচ কি ছয় গজ দূরে, তখন একেবারে দেহাতি পাঞ্জাবিতে হুমকি এল, আমি ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলেই আমাকে গুলি করা হবে।

আমার নিজেরও মাতৃভাষা পাঞ্জাবি, আমি ওই জুবান খুব ভাল করেই বুঝি। পরবর্তী কয়েক মিনিট ধরে আমাদের যা কথোপকথন, অত:পর তার সবই হল পাঞ্জাবিতেই।

আমি হুমকির জবাবে জানালাম, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কমান্ডাররা গতকালই আত্মসমর্পণ করেছে, কাজেই তারাও এখন অস্ত্র ফেলে দিলেই ভাল করবে।

মনে হল ওই সেনাদের কাছে আত্মসমর্পণের কোনও খবরই পৌঁছয়নি। তারা আবার হুমকি দিল, ঢুকতে চেষ্টা করলেই আমাকে মেরে ফেলা হবে।

খেলা শেষ

আমি তবুও গেটের দিকে এগোচ্ছিলাম। একেবারে সামনে আসতেই গেটের যে সেন্ট্রি বা রক্ষী ছিল, সে তার বন্দুকের সামনে লাগানো ধারালো বেয়নেটটা আমার শরীরে ঠেকিয়ে ধরল। ছাদের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা জওয়ানরা আবারও হুমকি দিল।

আমি তখন বললাম, 'দেখো, আমি ইন্ডিয়ান আর্মির একজন অফিসার। শহরের অন্য প্রান্ত থেকে একেবারে নিরস্ত্র অবস্থায় আমি একলা তোমাদের এখানে এসেছি - তার পরও কি তোমরা বুঝতে পারছ না সব খেলা চুকেবুকে গেছে? এখন আত্মসমর্পণ করা ছাড়া তোমাদের সামনে কোনও উপায় নেই!'

এই সব কথাবার্তা যখন হচ্ছে, তখনই আমাদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটা হেলিকপ্টার।

আমি সঙ্গে সঙ্গে সে দিকে আঙুল তুলে বললাম, 'তোমরা কি ওই হেলিকপ্টারটা দেখতে পাচ্ছো? বুঝতে পারছ কি ঢাকার নিয়ন্ত্রণ এখন কাদের হাতে?'

তারা সে দিকে দেখল ঠিকই, কিন্তু তারপরও খুব কঠিন গলায় বলল, 'ওসব আমরা কিছু জানি-টানি না। তুমি এখান থেকে দূর হঠো, ভেতরে ঢুকতে এলে আমরা কিন্তু গুলি করতে বাধ্য হব।'

কিন্তু আমি তখন আস্তে আস্তে বুঝতে পারছি, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে আমি ওদের ওপর 'আপারহ্যান্ড' পেতে শুরু করেছি। কারণ ওদের একজন এ কথাও বলল, 'আমরা আগে আমাদের সিনিয়রদের সাথে কথা বলব'।

আমার নিজের বিশ্বাস ছিল যে এই পাকিস্তানি জওয়ানদের আর কয়েক মিনিটের জন্যও ভরসা করা যাবে না। কারণ তারা ক্রমশ বেপরোয়া ও একরোখা হয়ে উঠছে - যে কোনও সময় যা কিছু করে ফেলতে পারে।

'বউ-বাচ্চাকে দেখতে চাইলে এটাই শেষ সুযোগ'

আমি এক সেকেন্ডও দেরি না-করে সঙ্গে সঙ্গে বললাম, 'তোমাদের সিনিয়র অফিসাররা তো সবাই সারেন্ডার করেছেন। কথা বলবে কার সঙ্গে? আর তা ছাড়া বাড়ির টেলিফোন লাইনও কাটা, কথা বলবেই বা কীভাবে?'

'তোমরা যদি এক্ষুনি সারেন্ডার না-করো, মুক্তিবাহিনীর লোকজন আর ভারতীয় সেনাদের হাতেই তোমাদের প্রাণ যাবে।'

'ওদিকে পাকিস্তানে তোমাদের পরিবারের লোকজন, বউবাচ্চারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। তোমরা কি চাও আবার তোমাদের দেখা হোক, না কি ওরা তোমাদের লাশ ফিরে পাক?

ওরা তবুও আত্মসমর্পণে রাজি হতে গড়িমসি করতে থাকে। কিন্তু কথার সুরে আর ধরনে বুঝতে পারি, তাদের প্রতিরোধ ক্রমশ দুর্বল হতে শুরু করেছে।

আমি তখন বারবার ওই কথাটাতেই জোর দিতে থাকি, নিজেদের স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে এটাই তোমাদের শেষ সুযোগ!

'এখনই সারেন্ডার করলে আমি ভারতীয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তোমাদের কথা দিচ্ছি, অক্ষত শরীরে তোমরা নিজেদের হেড কোয়ার্টাসে ফিরে যেতে পারবে। আর না-করলে তোমাদের লাশের যে কী হবে, তার কিন্তু কোনও গ্যারান্টি নেই।'

এই সব কথাবার্তা যখন চলছে, তখন গেটের সামনে রাইফেল ধরে-থাকা সেন্ট্রি ছেলেটার হাত-পা কিন্তু ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করেছে।

মাত্র আঠারো-উনিশ বছর বয়স হবে পাকিস্তানি ছেলেটার, চোখের সামনে আর রাইফেলের দূরত্বে একজন ভারতীয় সেনা অফিসারকে দেখে ভয় আর উত্তেজনা সামলাতে পারছিল না ও।

শরীরে ছুঁয়ে ছিল বেয়নেট

ওর বেয়নেটটা আমার শরীর স্পর্শ করে ছিল। কাঁপতে কাঁপতে ওর ট্রিগারে না চাপ পড়ে যায়, সেটা ভেবেই আমি হাত দিয়ে রাইফেলটা ধরে একটু ঠেলে আমার দিক থেকে পিছিয়ে দিলাম।

আর এ সবেরই মধ্যে নিজেদের মধ্যে কী সব কথাবার্তা বলে ধানমন্ডির ওই বাড়িতে ওই ডজনখানেক পাকিস্তানি সৈন্য অবশেষে আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়ে গেল।

গেটের মুখে তো একটা বালির বস্তা দিয়ে তৈরি বাঙ্কার ছিলই, পঞ্চাশ গজ দূরে ছাদের ওপরের বাঙ্কার থেকেও এতক্ষণ আমার দিকে রাইফেল উঁচিয়ে ছিল ওরা। ওরা সবাই নেমে আসার পর দেখি বাড়ির একেবারে সামনে আর একটা বাঙ্কার।

ওরা এসে একে একে ওদের লাইট মেশিনগান ও অটোমেটিক ওয়েপেনগুলো জমা করল।

সবগুলো অস্ত্র ছিল লোডেড, মানে গুলি ভরা। মনে মনে একবার ভাবলাম, এগুলো দিয়ে গুলি ছুঁড়লে নিরস্ত্র আমি তো কিছু্ই‌ করতে পারতাম না!

তারপর যেরকম কথা ছিল, আমি আমার দুই জওয়ানকে ডেকে পাঠালাম আর বললাম এই নিরস্ত্র পাকিস্তানি সৈন্যদের সোজা ড্রাইভ করে হেড কোয়ার্টাসে নিয়ে যেতে।

আমাদের গাড়িতে কতগুলো সাদা পোশাকও (সিভিলিয়ান ড্রেস) পড়ে ছিল, ওই সেনাদের বলা হল ওগুলো পরে নিতে - যাতে রাস্তায় কেউ পাকিস্তানি সেনা বলে চিনতে পেরে কোনও রকম হামলা না-করতে পারে।

এরপর আমি গিয়ে বাড়ির মূল দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকতে না-ঢুকতেই এগিয়ে এলেন বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী, শেখ ফজিলাতুন্নেসা।

তারা এতক্ষণ ভেতর থেকে আমাদের সব কথাবার্তাই শুনতে পাচ্ছিলেন। আমার কোনও পরিচয়ও দেওয়ার দরকার হল না, বুকভরা অবেগেই তারা যেন আমায় ভাসিয়ে নিয়ে গেলেন।

ওই বাড়িতে অবরুদ্ধদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী ছাড়াও ছিলেন তার কন্যা ও বাংলাদেশের আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আর কোলে তার মাত্র তিন মাসের শিশুপুত্র। ছেলেকে কোলে নিয়ে সেই প্রথম আমি শেখ হাসিনাকে দেখলাম।

পাশে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানাও। আরও ছিলেন পরিবারের দুজন অতিথিও। ফৌজি উর্দিতেও আমিও ততক্ষণে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছি।

এদিকে ততক্ষণে বাড়ির বাইরেও ভিড় জমতে শুরু করেছে। বঙ্গবন্ধুর এক কাজিন, নাম সম্ভবত খোকা, এগিয়ে এসে আমাকে বললেন, ধানমন্ডির বাড়ির ছাদে তখনও কিন্তু বাঁশে বাঁধা পাকিস্তানি পতাকা উড়ছে।

ওই খোকা-ই আমাকে একটা বাংলাদেশী পতাকাও এনে দিলেন।

আমি সঙ্গে সঙ্গে তরতর করে ছাদে গিয়ে বাঁশ থেকে পাকিস্তানি পতাকাটা নামিয়ে ছুঁড়ে দিলাম নিচে, টাঙিয়ে দিলাম বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা।

পদদলিত পাকিস্তানি পতাকা

পাকিস্তানি পতাকাটা মাটিতে পড়তেই শেখ ফজিলাতুন্নেসা সেটাকে পায়ের নিচে পিষে দিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন 'জয় বাংলা'। উপস্থিত জনতাও সমস্বরে বলে উঠল 'জয় বাংলা'।

ততক্ষণে আমার কাছে মেসেজ পৌঁছেছে, বাংলাদেশ সরকার বঙ্গবন্ধুর পরিবারের নিরাপত্তার দায়িত্ব না-নেওয়া পর্যন্ত আমাকে ধানমন্ডির ওই বাড়িতেই থাকতে হবে। ফলে সেখানে অনেকক্ষণ থাকতে হল, অনেক গল্প হল দুই বোন হাসিনা ও রেহানার সঙ্গেও।

এক-দুদিনের মধ্যেই অবশ্য সব নিরাপত্তার ব্যবস্থা হয়ে গেল। এদিকে আমার ডিভিশনেরও বাংলাদেশ ছাড়ার সময় হয়ে গেছে, আমিও ফেরার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম।

কিন্তু এর মধ্যেই খবর এল, শেখ মুজিবের কানে খবর পৌঁছেছে অশোক তারা নামে তরুণ এক ভারতীয় মেজর কীরকম নাটকীয়ভাবে তার স্ত্রী-কন্যাদের রক্ষা করেছেন। তিনি না কি দেশে ফিরে ওই কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করতে চান।

অগত্যা আমার দেশে ফেরাও পিছিয়ে গেল। এর মাঝে প্রতিদিনই আমি একবার করে ঢুঁ মারতাম ধানমন্ডিতে, দেখে আসতাম নিরাপত্তা ও অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা।

জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে ফিরে আসার পর ১২ তারিখেই তিনি আমায় ডেকে পাঠালেন।

আমি বাড়িতে যেতেই ওই গগনস্পর্শী ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষটি আমায় জড়িয়ে ধরে বললেন, 'তুমি আমার আর এক ছেলে। তোমার জন্য আমার দরজা সব সময় খোলা থাকবে, তুমি যখন খুশি আসবে!' আবেগে তখন আমারও গলা ধরে আসছে।

শেখ মুজিবের সান্নিধ্যে

আমার মতো সামান্য এক সেনা কর্মকর্তার সঙ্গেও নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথাবার্তা বলতে এতটুকু দ্বিধা করতেন না ওই রাষ্ট্রনায়ক।

মনে আছে, তিনি একটা কথা খুব বলতেন, 'ন'মাস ধরে একটা জাতির ওপর যে প্রবল অত্যাচারটা চলেছে, সেখান থেকে কীভাবে আবার আমরা শিরদাঁড়া সোজা করে উঠে দাঁড়াব সেই চিন্তাটাই শুধু আমায় কুরে কুরে খায়!'

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সময় কাটানোর সেই বিরল মুহূর্তগুলোর স্মৃতি নিয়ে আমি ভারতে ফিরলাম ১৯৭২-এর ২০শে জানুয়ারি।

এর পর বোন শেখ হাসিনার সঙ্গে আবার আমার দেখা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল বছর চারেক বাদে।

বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর শেখ হাসিনা তখন স্বামী সন্তানদের নিয়ে ভারতের আশ্রয়ে। পরে আমি শুনেছিলাম, দিল্লিতে থাকাকালীন তিনি বেশ কয়েকবার আমার খোঁজ করেছিলেন, দেখা করতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু আমি তখন আর্মির পোস্টিংয়ে প্রায় পুরোটা সময়ই দিল্লির বাইরে বাইরে। তা ছাড়া সম্ভবত প্রোটোকলগত বা রাজনৈতিক কোনও বাধাও ছিল, যে কারণে দুর্ভাগ্যবশত তিনি আমাকে সে সময় খুঁজে বের করতে পারেননি।

এর পরের চমকটা এল বহু বছর বাদে। আমি তখন সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে দিল্লির উপকন্ঠে ছোট্ট একটা বাড়ি বানিয়ে থিতু হয়েছি, স্ত্রীর সঙ্গে সময় কাটাচ্ছি আর গল্প করছি।

আবার দেখা চল্লিশ বছর বাদে

২০১২ সালে একদিন সকালে হঠাৎ দিল্লির বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে ফোন পেলাম, মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য তাদের সরকার আমায় স্বীকৃতি জানাতে চায়। এতদিন বাদে সেই ফোন পেয়ে ভীষণ খুশি আর অবাক হয়েছিলাম।

কিছুদিন বাদেই আমন্ত্রণপত্র, বিমানের টিকিট ইত্যাদি চলে এল। ১৮ অক্টোবর সস্ত্রীক পাড়ি দিলাম ঢাকার দিকে, যে শহর ছেড়ে এসেছিলাম চল্লিশ বছরেরও বেশি আগে।

সেই সফরেই আবার দেখা হল শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার সঙ্গে। প্রায় ঘন্টাদুয়েক ধরে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে আমি সস্ত্রীক বসে চল্লিশ বছর আগের ১৭ই ডিসেম্বরের সেই ঘটনাবহুল দিনটার স্মৃতিচারণ করলাম।

সেদিনের এমন অনেক ঘটনার কথা শেখ হাসিনা নিজে থেকেই অবতারণা করলেন, যেগুলো তার আগে আমিও কখনও কাউকে বলিনি।

শেখ হাসিনা
Getty Images
শেখ হাসিনা

রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের হাত থেকে যখন 'ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ' সম্মান নিচ্ছি, প্রধানমন্ত্রী হাসিনা আমার পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, 'উনিই কিন্তু আমাদের জীবন বাঁচিয়েছিলেন!'

একাত্তরের যুদ্ধে যে 'ব্যাটল অব গঙ্গাসাগরে'র জন্য আমি ভারতে 'বীর চক্র' খেতাব পেয়েছি, ত্রিপুরা সীমান্তের কাছে সেই গঙ্গাসাগর জায়গাটায় পরদিন আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও করে দিলেন প্রধানমন্ত্রী হাসিনা।

BBC

English summary
How Indian Army have Protected Mujib family in Dhaka on December 17, 1971
চটজলদি খবরের আপডেট পান
Enable
x
Notification Settings X
Time Settings
Done
Clear Notification X
Do you want to clear all the notifications from your inbox?
Settings X