ইরানের ২৬ বছর বয়সী বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড!পরিবারের কাছে শেষ দেখা করার জন্য দেওয়া হয়েছিল মাত্র ১০ মিনিট
ইরানের তরুণ বিক্ষোভকারী ইরফান সোলতানির বয়স মাত্র ২৬। হাতে থাকা স্বপ্নগুলো এখনও রঙিন, জীবনটা চলছিল সাধারণ ছন্দেই ফ্যাশন আর খেলাধুলায় মগ্ন একজন যুবকের মতো। কিন্তু রাষ্ট্রের চোখে সেই সাধারণ জীবনই হয়ে উঠল 'অপরাধ'। শেষ পর্যন্ত সেই অপরাধের মূল্য দিতে হচ্ছে মৃত্যুদণ্ডে, আর পরিবার পেল মাত্র ১০ মিনিট সময়, শেষবার তাকে দেখার জন্য।
৮ জানুয়ারি রাতে রাজধানী তেহরানের নিকটবর্তী কারাজ অঞ্চলে নিজের বাড়ির কাছে আটক করা হয় ইরফানকে। অভিযোগ খামেনি বিরোধী বিক্ষোভে যোগদানের সাহস দেখানো। পরিবারের কাছে তিনদিন কোনো খবরই পৌঁছয়নি। এরপর হঠাৎই যোগাযোগ, কিন্তু তা কোনো মামলার নোটিশ বা শুনানির তথ্য নয়, বরং জানানো হয় মৃত্যুদণ্ড ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত।

ইরানের কুখ্যাত নিরাপত্তা সংস্থা স্পষ্ট জানায়, দণ্ডের ধরন "মোহারেবা" রাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, 'ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ'। এই অপরাধের শাস্তি মৃত্যুই।
মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ এ যেন রীতিমতো 'ক্ষেত্র-নির্বাচিত ফাঁসি'। কোনো আইনজীবীর সুযোগ নেই, কোনো আদালতের শুনানি নেই, কোনো আপিলের সুযোগ নেই। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে গ্রেপ্তার থেকে মৃত্যুদণ্ড, এক কথায়, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসই যেন।
ইরানি মানবাধিকার আইনজীবী মহম্মদ ওলিয়াইফার বলেন নিজেদের আইনেও এমন দ্রুত মৃত্যু কার্যকর করা সম্ভব নয়। ন্যূনতম ১০ দিন থেকে ৩০ দিনের আইনি প্রক্রিয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু এরফানের ক্ষেত্রে সবই অগ্রাহ্য হয়েছে।
সোলতানির পরিবারের ওপর চলছে নজিরবিহীন চাপ। কথা বললে গ্রেপ্তার করা হবে, এমন সতর্কবার্তা পৌঁছে গেছে নিরাপত্তা সংস্থার পক্ষ থেকে। তবুও পরিবারের সূত্র জানায়, ইরফান আগেও পর্যবেক্ষণের তালিকায় ছিল, হুমকি পেতেও শোনা গিয়েছে। কিন্তু তরুণের জবাব ছিল সরল "দমন করে সত্য থেমে থাকে না।"
মুদ্রাস্ফীতি, আর্থিক সংকট আর মুদ্রার পতনে জর্জরিত ইরান। সেখান থেকেই জন্ম আন্দোলনের। ২০ দিন পেরিয়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে ২৮০টিরও বেশি স্থানে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির দাবি এ পর্যন্ত প্রায় ২,০০০ মানুষকে হত্যা ও ২০,০০০ এর বেশি গ্রেপ্তার করেছে খামেনি নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তা বাহিনী।
ইন্টারনেট বন্ধ, বিদেশি সাংবাদিক ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষক নিষিদ্ধ, অন্ধকারে চলছে দমন পীড়নের রাষ্ট্রীয় মেশিন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল থেকে শুরু করে বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন ইরান সরকার 'নজিরবিহীনভাবে তাৎক্ষণিক মৃত্যুদণ্ড' কার্যকর করছে প্রতিবাদীদের ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে।
ইরানি আমেরিকান সাংবাদিক মাসিহ আলিনেজাদের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে আতঙ্কের বক্তব্য "ইন্টারনেট বন্ধ, রাস্তায় গুলি, আর দ্রুত মৃত্যুদণ্ড, ২১ শতকে সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘন।"
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছেন "প্রতিবাদ চালিয়ে যান, সাহায্য আসছে পথে", কিন্তু সহায়তা কবে আসবে, আদৌ আসবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
পরিবারকে বলা হয়েছিল, 'দেখে নিন, এটাই শেষ দেখা'। মাত্র দশ মিনিট। সেই দশ মিনিটেই শেষ হলো মায়ের চোখের আলো, বাবার আশা, বন্ধুর স্বপ্ন আর জীবনের অনন্ত সম্ভাবনা।
তবে মূল প্রশ্ন, এরকম কতজন আড়ালে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছেন?
ইন্টারনেট বন্ধ থাকার ফলে বাইরে কোনো খবর বেরোচ্ছে না। তাই ইরফান সোলতানির ঘটনা হয়তো বরফের চূড়া অদৃশ্য অগণিত গল্প নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে আতঙ্কের অন্ধকারে।
সাহস বনাম রাষ্ট্র, এই যুদ্ধ কোথায় গিয়ে শেষ হবে তা কেউ জানে না। তবে ইতিহাস বলছে, যে সমাজ ভয় দেখিয়ে নীরবতা কিনতে চায়, সেখানে নীরবতা একদিনই ভাঙে।












Click it and Unblock the Notifications