অপারেশন সিঁদুরে সেনা মৃত্যুর কথা স্বীকার করে নিল পাকিস্তানও, রাহুল গান্ধী কি এবারও প্রশ্ন তুলবেন?
যুদ্ধ ও কূটনীতির ময়দানে সচরাচর বড় বড় ঘোষণার মাধ্যমে সত্য প্রকাশিত হয় না; বরং অনিচ্ছাকৃত স্বীকারোক্তির মধ্য দিয়েই তা বেরিয়ে আসে। সাম্প্রতিক 'অপারেশন সিঁদুর'-এ অংশ নেওয়া ১৩৮ জন পাকিস্তানি সেনাকে বীরত্বের পদক প্রদানের সিদ্ধান্ত তেমনই একটি স্বীকারোক্তি। যে দেশ কার্গিলে তাদের ভূমিকার কথা অস্বীকার করেছে, নিজেদের সেনাদের মৃতদেহ গ্রহণ করেনি এবং বছরের পর বছর ধরে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ খারিজ করে এসেছে, তাদের এই সম্মাননা তালিকা অস্বীকারের প্রাচীরে ফাটল ধরিয়েছে।
এটি ভারতের দীর্ঘদিনের বক্তব্যকে নিশ্চিত করে যে, ভারতীয় আক্রমণের মুখে পাকিস্তান ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্ত তাদের গুরুতর ক্ষতির ইঙ্গিতবহক। আদতে মৃতের সংখ্যা হাজার খানেক ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই ঘটনাকে রাহুল গান্ধীর ভারতীয় সামরিক পদক্ষেপের প্রমাণ চাওয়ার দাবির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এবং মোদী সরকারের সন্ত্রাসবাদ দমনের পদ্ধতির বিপরীতে ইউপিএ সরকারের পদক্ষেপের সমালোচনা করা হয়েছে।

বলিদান ছাড়া পদক দেওয়া হয় না। যদি ১৩৮ জন সেনাকে সম্মানিত করা হয়, তবে আরও শত শত সেনার মৃত্যু উল্লেখহীন হয়ে রয়েছে। যাদের সংখ্যা গোপন করা অসম্ভব। কার্গিলের পর এটিই পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় স্বীকারোক্তি। সেবার পাকিস্তান ৪৫৩ জনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছিল, যদিও ভারত জানত প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি। একই যুক্তিতে, এই ১৩৮টি পদক মাত্র ৩৬ ঘণ্টার যুদ্ধে আরও বেশি মৃত্যুর ইঙ্গিত দেয় নিঃসন্দেহে।
কিন্তু ভারতের রাজনৈতিক বিতর্ক যেন ক্রমেই বেশি করে আবর্তিত হচ্ছে। ২০১৬ সালের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক এবং ২০১৯ সালের বালাকোট বিমান হামলার পর রাহুল গান্ধী এগুলোর প্রমাণ চেয়েছিলেন। তিনি সরকারকে প্রশ্ন করেছিলেন, সেনাবাহিনীর ক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন এবং পাকিস্তানের অস্বীকারের প্রতিধ্বনি তুলে দিয়েছিলেন ভারতের অন্দরে। এখন, যখন পাকিস্তান নিজেই 'অপারেশন সিঁদুর'-এ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করছে, তখন প্রশ্ন ওঠে: রাহুল গান্ধী কি তাদের কাছ থেকেও প্রমাণ চাইবেন?
তিনি কি ইসলামাবাদকে মৃত সেনাদের নাম, কফিন এবং প্রমাণের তথ্য প্রকাশ করতে বলবেন? নাকি তাঁর সন্দেহ কেবল ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত, পাকিস্তানের জন্য নয়? কারণ এবার প্রমাণ নয়াদিল্লি থেকে আসেনি, এসেছে ইসলামাবাদ থেকে। অপারেশন সিঁদুর'-এ তারা যতজনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছে, প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়েও বেশি। এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনা।
পাকিস্তান দশকের পর দশক ধরে সন্ত্রাসবাদকে লালন করার মূল্য চোকাচ্ছে। আর ভারতের জন্য এর তাৎপর্য সামরিক ও রাজনৈতিক উভয়ই। রাহুল গান্ধী যদি পাকিস্তানের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন না তোলেন, তাহলে ভারতের বিজয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনও নৈতিক অধিকার তার নেই। পাকিস্তানের এই বীরত্বের পদক তালিকা নিশ্চিত করে যে ভারত অবশেষে তার প্রতিবেশীকে দশকের পর দশক ধরে সন্ত্রাসবাদের মূল্য দিতে বাধ্য করেছে।
এটি কেবল একটি অপারেশনের বিষয় নয়; এটি ২৬/১১ মুম্বই হামলা, ২০০১ সালের সংসদ হামলা এবং ইউপিএ সরকারের আমলে অসংখ্য জঙ্গি হামলার বিচারের বিষয়, যখন সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপের পরিবর্তে শুধু কাগজপত্র তৈরি করা হয়েছিল। ১৯৯৯ সালের কার্গিলের পর একক সংঘাতে পাকিস্তানের স্বীকার করা হতাহতের এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা, যখন ইসলামাবাদ ৪৫৩ জনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছিল, যদিও ভারতের অনুমান ছিল প্রায় ৪ হাজার সেনা নিহত হয়েছিল।
একই যুক্তিতে, পাকিস্তানের ১৩৮টি পদক এখন 'অপারেশন সিঁদুর'-এ হাজার খানেক মৃত্যুর ইঙ্গিত। মাত্র ৩৬ ঘণ্টার ভারতীয় আক্রমণে এমনই ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এই বীরত্বের তালিকা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন পাকিস্তান কাশ্মীর উপত্যকায় বছরের পর বছর ধরে হিংসায় উস্কানি দেওয়া বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা সৈয়দ আলি শাহ গিলানিকে মরণোত্তর সম্মাননা দিয়েছে।
ইউপিএ সরকারের আমলে, গিলানি ভারতবিরোধী প্রচারের মুখ হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, সরকারি সুবিধা এবং সরকারের কাছে থেকে কখনও কড়া ব্যবহার পাননি। এখন পাকিস্তান তাকে তাদের সর্বোচ্চ অসামরিক পুরস্কারে ভূষিত করেছে। এটি মনে করিয়ে দেয় যে কীভাবে একের পর এক কংগ্রেস সরকারগুলি বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনের পরিবর্তে এমন নেতাদের প্রশ্রয় দিয়েছে।
এর বিপরীতে, মোদি সরকার স্পষ্ট লাল রেখা টেনেছে: সন্ত্রাসবাদ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদ সহ্য করা হবে না। পাকিস্তান এখন জানে যে যেকোনও সীমান্ত পার দুঃসাহসের জন্য চড়া মূল্য দিতে হবে। ২৬/১১-এর শিকারদের জন্য, 'অপারেশন সিঁদুর' একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত উত্তর। সেই হামলা পাকিস্তানের মাটি থেকে সামরিক সহায়তায় পরিকল্পিত ও কার্যকর করা হয়েছিল।
তবুও ইউপিএ আমলে ভারতের প্রতিক্রিয়া কেবল কূটনৈতিক নোট এবং আন্তর্জাতিক আবেদন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। সতেরো বছর পর, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী নিজেই মূল্য দিয়েছে। এটি কেবল সামরিক প্রতিশোধ নয়; এটি একটি কৌশলগত ন্যায়বিচার – এটি একটি অমোঘ বার্তা যে পাকিস্তান পরিচালিত সন্ত্রাসবাদ বিনা জবাবে থাকবে না।
বাজপেয়ীর অধীনে কার্গিল থেকে মোদীর অধীনে 'অপারেশন সিঁদুর' পর্যন্ত, ভারত শক্তিশালী সরকারের নেতৃত্বে ধারাবাহিকভাবে সংকল্প দেখিয়েছে। কার্গিলে পাকিস্তান সেনা নিতে অস্বীকার করেছিল। আর এবার ইসলামাবাদ উপায় না দেখে আংশিক স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হয়েছে। তবে এর মাঝে কী ঘটেছিল? কংগ্রেস জবাব দেবে?
ইউপিএ-র এক দশকের শাসনে, ভারত দিল্লি, মুম্বই, হায়দরাবাদ এবং পুনেতে জঙ্গি হামলার এক ধারাবাহিকতা দেখেছে। প্রতিবারই ভারতের পাল্টা ফলাফল হতাশাজনক ছিল। প্রতিপক্ষ কখনও সেভাবে গুরুত্বই দেয়নি ভারতকে। এখন পার্থক্য স্পষ্ট: মোদীর ভারত সম্পূর্ণ শক্তি দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানায়, নিশ্চিত করে যে পাকিস্তান পরিণতি যেন কখনও না ভোলে।
সুতরাং জাতীয় প্রশ্নটি এড়ানো যায় না: রাহুল গান্ধী কি এই প্রমাণ স্বীকার করবেন? তিনি কি পাকিস্তানের কাছে তাদের নিজেদের হতাহতের প্রমাণ চাইবেন? নাকি তিনি বরাবরের মতো তাঁর সন্দেহ কেবল নিজের সরকারের জন্য সংরক্ষিত রাখবেন, এমনকী যদি তা ভারতের শত্রুর হাতকে শক্তিশালী করে, তাও?
'অপারেশন সিঁদুর' কেবল একটি সামরিক বিজয় নয়; এটি একটি মতবাদের মোড় পরিবর্তন। এটি প্রমাণ করে যে ভারত, একটি সিদ্ধান্তমূলক নেতৃত্বের অধীনে, প্রতিটি জঙ্গি কার্যকলাপের পাল্টা বদলা নেবে। তবে কংগ্রেসের জন্য হিসাবটা ভিন্ন। যে দল একসময় ভারতের জয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল, তাকে এখন ব্যাখ্যা করতে হবে কেন তারা পাকিস্তানের পরাজয় নিয়ে কখনও প্রশ্ন তোলে না। এবং রাহুল গান্ধীর জন্য বিশেষ করে, পছন্দটি স্পষ্ট: হয় ইসলামাবাদ থেকেও প্রমাণ চাওয়া, নয়তো স্বীকার করা যে তাঁর সন্দেহ সবসময় সত্য জানার চেয়ে রাজনৈতিক অভিষন্ধিতে ভরা ছিল। কারণ যদি পাকিস্তান নিজেই নিজেদের ক্ষতির মাত্রা স্বীকার করে, তাহলে ভারতের জয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনও নৈতিক অধিকার রাহুল গান্ধীর নেই।












Click it and Unblock the Notifications